করোনা ‘পজেটিভ’ হয়েও ডা. শাহ আলমের ‘নেগেটিভ’ কর্মকান্ড

প্রকাশিত: ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০

করোনা পজেটিভ হয়েই চেম্বারে বসে রোগী দেখছিলেন সিলেটে গ্রেপ্তার হওয়া ডা. শাহ আলম। মানছিলেন না কোনো নিয়ম। এমনকি চেম্বারে বসে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে প্রবাসীদের কাছে বিক্রি করছিলেন ভুয়া করোনা রিপোর্টও। করোনায় কোনো ভয় ছিল না তার। টাকা কামাইয়ের ধান্দায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। গ্রেপ্তারের পরদিন নমুনা রিপোর্টে তার করোনা পজেটিভের তথ্য এসেছে। এর আগেও আরেক দফা তিনি করোনা পজেটিভ হয়েছিলেন। ভুয়া করোনা রিপোর্ট বিক্রি, চেম্বারের রোগী দেখা এবং প্রতারণার দায়ে চার মাসের দণ্ড পাওয়া এই ডাক্তারকে নিয়ে সিলেটে তোলপাড় চলছে।

ঢাকায় ডা. সাবরিনার ঘটনাও তার প্রতারণা দমাতে পারেনি। দেশজুড়ে আলোচিত এ ঘটনা শোনার পরও তিনি সিলেটে নিজ বাসায়ই চালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রতারণা। তার কাছে প্রতারিত হয়ে দুই প্রবাসী ইতিমধ্যে আমেরিকা চলে গেছেন। তবে আমেরিকা যাওয়ার আগে তারা ঢাকায় গিয়ে নমুনা দিয়ে সঠিক ল্যাব রিপোর্ট নিয়েই বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। ডা. শাহ আলম সাগর। সিলেটের মেডিকেল রোডের কাজলশাহ এলাকার মেডিনোভায় তার চেম্বার। তিনি নিজেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার পরিচয় দিয়ে নিজের চেম্বারে বসে রোগী দেখছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন না। অথচ তার ভিজিটিং কার্ড, চেম্বারের সামনে সাইনবোর্ডসহ সবখানেই ওসমানী মেডিকেলের পরিচয়ে পরিচিতি ঘটান। স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরে মেডিনোভায় চেম্বার খুলে বসেন ওই ডাক্তার। তিনি নিজেকে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দেন। প্রতিদিন তিনি ১৫-২০ জন রোগী দেখতেন। ল্যাব রিপোর্টে জানা গেছে, ডা. শাহ আলম সাগর প্রথম দফা ১২ই এপ্রিল করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন। এরপর রিপোর্ট আসে তিনি পজেটিভ। তবে পজেটিভ হলেও মেডিনোভার চেম্বারে বসে রোগী দেখছিলেন। সোর্স মারফত তিনি বিদেশগামী যাত্রীদের তার চেম্বারে নিয়ে যান। সেখানে তিনি প্রবাসযাত্রীদের পরীক্ষা করার পর করোনা সার্টিফিকেট দেন। ইতিমধ্যে একাধিক যাত্রীকে এই সার্টিফিকেট প্রদান করেছেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে ভুয়া সার্টিফিকেট প্রদানের অভিযোগ উঠায় রোববার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট সুনন্দা রায়সহ র‌্যাবের একটি দল তার চেম্বারে অভিযান চালায়। অভিযানকালে তার চেম্বার থেকে ভুয়া করোনা রিপোর্টের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে ডা. শাহ আলম ভুয়া করোনা রিপোর্ট প্রদানের ব্যাপারটি স্বীকার করেন। এ কারণে তার চেম্বারে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে চার মাসে কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। চেম্বারে বসেই ডা. শাহ আলম জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন। এক পর্যায়ে ডা. শাহ আলম নিজেকে করোনা পজেটিভ হিসেবে দাবি করেন। তার কথায় উপস্থিত থাকা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, করোনা পজেটিভ হয়েই ডা. শাহ আলম চেম্বারে রোগী দেখছিলেন। তিনি প্রতারণাও করছিলেন। তার কাছ থেকে অনেক রোগী করোনা সংক্রমিত হতে পারে বলে দাবি করেন তারা। এদিকে গ্রেপ্তারের আগের দিন গত শনিবার দ্বিতীয় দফা পরীক্ষার জন্য ডা. শাহ আলম নমুনা দিয়েছিলেন। সোমবার সেই রিপোর্টও পজেটিভ এসেছে। অর্থাৎ তিনি দ্বিতীয় বারও করোনা পজেটিভ হলেন। আর পজেটিভ অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটসহ র‌্যাব সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করেছেন। ওসমানী হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় জানিয়েছেন, ডা. শাহ আলম নামের কেউ ওসমানীতে কর্মরত নন বা ছিলেনও না। কর্মরত না থাকলে কেউ পদবি ব্যবহার করতে পারে না। অভিযানে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুনন্দা রায় জানিয়েছেন, বিদেশযাত্রীদের জন্য বিভিন্ন দেশ ও এয়ারলাইন্স করোনাভাইরাস নেগেটিভ সার্টিফেকেট বাধ্যতামূলক করার পর প্রবাসীদের টার্গেট করেন তিনি। করোনা সার্টিফিকেট দেয়ার কথা বলে বিদেশযাত্রীদের কাছ থেকে তিনি চার হাজার টাকা করে আদায় করেন। ফ্লাইটের ৪৮ ঘণ্টা আগে রোগী বা যাত্রীকে না দেখেই তিনি তার প্যাডে প্রত্যয়নপত্রে লিখে দেন ওই ব্যক্তিকে তার চেম্বারে দেখেছেন।