করোনা থেকে শিক্ষা ও নতুন পথের সূচনা

প্রকাশিত: ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২০

 

কোভিড-১৯ বিশ্বের লাখ লাখ প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং জনমনে একটা অজানা অস্বস্তি ও আতংক সৃষ্টি করেছে৷ কবে করোনা দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে তা কারো জানা নেই৷ ইতিমধ্যে কয়েকটি টীকার সফল পরীক্ষার খবর আসলেও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞদের মতে করোনা চিরতরে চলে যাবে না; এর সাথে যুদ্ধ করেই মানুষকে জীবন যাপন করতে হবে৷ করোনা শুধু আতংক আর মহামারীর নামই নয়, এটি মানুষে পরিশুদ্ধ হতে সুযোগ দিয়েছে৷ কিছু দক্ষতা অর্জনেও মানুষকে সহায়তা করেছে৷ করোনাকে কেউ নিয়েছে সংযম হিসেবে কেউ নিয়েছে রাহাজানির সুযোগ হিসেবে৷ তবে যে যেভাবেই নেক সে ভাবেই ফল ভোগ করছে৷ দুর্নীতিবাজদের গলায় কাটা আটকিয়েছে এবং পিছপা হওয়া চিকিৎসকদের পর্দা সরে আসল চেহারা বের হয়েছে৷ তাদেরকে বর্জন করে সৎ ও যোগ্য লোকদের নিয়ে দেশ এগিয়ে নেয়ার একটা সুযোগ করোনা সৃষ্টি করে দিয়েছে৷ অন্যদিকে মানুষ কিভাবে নিজের জীবনের বাজি রেখে অন্যকে জীবন বাচাঁতে মরিয়া হয়ে উঠে, নিজের খাবার অন্যের সাথে কিভাবে ভাগাভাগি করতে হয়, কিভাবে পরোপকারিতায় অন্যের নিকট হাত বাড়াতে হয় সরকারের সাথে সাথে সাধারণ মানুষও কতটা হৃদয়গ্রাহী হয় তা বিশ্ববাসী দেখেছে৷ অন্যদিকে কিভাবে অন্যের প্রণোদনার টাকা নিজের পকেটে পুরাতে হয়, গরীবের জন্য বরাদ্ধের চাল নিজের গুদামে ঢুকাতে হয়, করোনা টেস্ট ব্যতীত ইচ্ছামত নেগেটিভ বা পজিটিভ রিপোর্ট দিতে হয় তাও বিশ্ববাসীকে করোনায় দেখিয়েছে৷
শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখতে একদল শিক্ষানুরাগী শিক্ষক নিজ ব্যয়ে কারো কোনো নির্দেশ ও পরামর্শ ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে নিজ উদ্যোগে অনলাইন স্কুলের মাধ্যমে ক্লাশ নিচ্ছে৷ করোনা অনলাইন ক্লাশ নিতে ও গ্রহণ করতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে বিশেষ দক্ষ করে তুলেছে৷ পরিস্থিতি ভালো হলেও করোনা থেকে শিক্ষা অনলাইন ক্লাশ চলমান থাকবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আভাস পাওয়া গিয়েছে৷ অন্যদিকে কিছু শিক্ষক এ সুযোগটাকে অন্যভাবে কাজে লাগিয়েছে৷ আবার কিছু স্কুল অনলাইনে ক্লাশ পরীক্ষার নামে সাধারণ সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত টিউশন ফি ও বিভিন্ন ফিস আদায় করছে৷ বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও মানুষের কর্সংস্থানের অভাব সৃষ্টি হওয়ায় মানুষের জীবিকা অর্জনে আঘাত লাগছে অথচ তাদের সন্তানের শিক্ষার নামে কাটা পকেটটি আরো কেটে নিচ্ছে৷ মানুষকে মানুষ চেনার একটা সুবর্ণ সুযোগ এখন যাচ্ছে৷ করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে৷ কিন্তু শিক্ষকদের বেতন একদিনেরও কমতি হয় নাই এজন্য একজন শিক্ষক হিসেবে সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি৷ শিক্ষকতাকে শুধু চাকরিই নয় একটা মানব সেবার ব্রত হিসেবে ধরে নিয়ে সবাই যার যার অবস্থান থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদানের জন্য সহায়তা করাই একজন আদর্শ শিক্ষকের এ মুহুর্তে উত্তর কাজ৷ কিন্তু রাস্তায় বের হলেই যখন বইয়ের ব্যাগ নিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট সেন্টারে যেতে দেখা যায় মনে প্রশ্ন জাগে- করোনা কি দেশ থেকে চলে গিয়েছে? সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে কি অতিরিক্ত আয়ের পথটার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে?
করোনায় আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে যে, মেডিকেলে পড়ে ডাক্তার হওয়ার জন্য শুধু বই পড়ে ভর্তি পরীক্ষা উক্তীর্ণই যথেষ্ঠ নয়৷ অনেক বড় মাপের ডাক্তারও করোনার নাম শুনে হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়েছিল৷ ডাক্তারের নিষ্ঠুরতা ও ভীরুতার কারণে অনেক করোনাহীন রোগিও চিকিৎসার অভাবে মরতে হয়েছে৷ পৃথিবীর যেকোনো দেশেই ডাক্তারদের এ রকম আচরণ বিরল৷ তাই বুঝার সময় এসেছে যে, মেডিকেল পড়তে হলে পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের পরীক্ষাসহ হার্টের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরকেই মেডিকেলে পড়ার সুযোগ দিতে হবে৷ সাধারণ মানুষের কর্ষ্টার্জিত টাকায় ডাক্তার হয়ে সে মানুষগুলোই নিজ টাকা ব্যয়ে চিকিৎসার করতে গিয়ে হয়রানি হয়ে অবশেষে চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে তা কখনো মেনে নেয়ার মত নয়৷ আবার কিছু ডাক্তার সংসার-সন্তান ভুলে রোগির সেবায় নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে মানুষের মনে তাঁদের সুনাম চিরতরে ঠাই করে নিয়েছে৷
পরিশেষে বলবো, করোনা যেমন মানুষের মাঝে আতংক সৃষ্টি করছে তেমনি মানুষকে মানুষ চেনার সুযোগ প্রদানসহ মানুষের চোখের পর্দা সরিয়ে দিয়েছে৷ করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার রাস্তায় সকল ধরনের ময়লা ও কাটা দূর করে চলার পথ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে অগ্রসর হওয়া হবে সার্বজনিন মঙ্গলজনক৷
লেখক- মোহাম্মদ মহসিন মিয়া
সহকারী প্রধান শিক্ষক৷


Categories