করোনার ভুয়া রিপোর্টে ছোট হচ্ছে আকাশপথ

প্রকাশিত: ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২০

করোনা ভাইরাসের টেস্ট নিয়ে প্রতারণা এবং টেস্টের মান নিয়ে উদ্বেগ থাকায় বাংলাদেশকে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে রাখছে অনেক দেশ। ইতোমধ্যে ইতালি, জাপানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, চীনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে দুই এয়ারলাইনস।

এছাড়া প্রত্যাহারের পর দ্বিতীয়বার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তুরস্ক এবং বাংলাদেশিদের জন্য কড়া বিধিবিধান প্রস্তুত করে দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিমান বাংলাদেশও আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নিজেদের সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে।

সর্বশেষ করোনার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে সাড়ে ৪ লাখ রিয়াল জরিমানা করেছে সৌদি আরব। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় কোটি টাকার বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, করোনা ভাইরাস টেস্টের মান যদি উন্নত না হয় তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেকায়দায় পড়তে পারে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এমনিতেই আকাশপথে যাত্রীর সংকট, এর মধ্যে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপে বিপর্যয়ের মুখে বিমান। ইতালিতে বাংলাদেশিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিষয়ে দেশটির সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেছে বেবিচক। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এত বড় কঠোর সিদ্ধান্তের কারণও জানতে চাওয়া হয়েছে।

ভিডিও কনফারেন্সে ইতালির সিভিল এভিয়েশন জানিয়েছে, দেশটি স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের অবজারভেশন অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা সে দেশে গিয়ে ঠিকমতো কোয়ারেন্টাইন মানছেন না। তারা বাইরে চলাফেরা করছেন। তাদের কোনোমতেই কোয়ারেন্টাইনে বাধ্য করা যাচ্ছে না। দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, বাংলাদেশি প্রবাসীরা ইতালির ক্ষতি করছেন। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞা। বাংলাদেশি প্রবাসীদের এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত সরকারও। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেবিচক বিদেশগামীদের জন্য আরো কঠোর বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুন আরোপ করতে যাচ্ছে। ইতালি কেবল বাংলাদেশের নাগরিকদের নয়, বরং তারা ১৩টি দেশের নাগরিকদের সে দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

ইতোমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশ গমনকারীদের জন্য ‘করোনা নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এই ‘করোনা নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশে কভিড-১৯ টেস্টের ফল নেগেটিভ হলেও বিদেশে যাওয়ার পর সেই ফল পজিটিভ হয়েছে।

বেবিচক বলছে, যাত্রীদের খামখেয়ালিপনার কারণে এ ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অন্য রাষ্ট্রগুলো। যাত্রীদের জন্য বেবিচক আরো কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্ক্রিনিংয়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে মেডিকেল অফিসার চাওয়া হয়েছে। এত দিন এ দায়িত্ব পালন করতেন বেবিচকের সিকিউরিটি অফিসাররা।

সূত্র জানায়, স¤প্রতি কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে বিমান চলাচলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ যোগ হয়েছে ইতালি। বাংলাদেশ বিমানের সেই ফ্লাইটে ২২৫ জন যাত্রীর মধ্যে ২১ জনের দেহে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। ভুয়া করোনা সনদের ‘বদনাম’ ছড়িয়ে পড়ার জেরে রোমের দুটি বিমানবন্দরে অবতরণ করা ১৮২ বাংলাদেশির মধ্যে ১৬৭ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। দেশটির প্রথম সারির সব গণমাধ্যমে বাংলাদেশে এ জাতীয় ভুয়া করোনা সনদ সরবরাহের খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে দেশজুড়ে।
তবে গতকাল বৃহস্পতিবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক কোভিড-১৯ পরীক্ষার ভুয়া সনদ নিয়ে ইতালি যাননি।

সম্প্রতি যে এক হাজার ৬০০ বাংলাদেশি ইতালি গেছেন তারা কোভিড-১৯ নেগেটিভের ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে যাননি। তাদের মধ্যে কিছু যাত্রী নিজ উদ্যোগে কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে যান, পরে প্রয়োজন হতে পারে এমনটি ভেবে। তবে ইতালি ভ্রমণের জন্য এ ধরনের সার্টিফিকেট থাকার কোনো নির্দেশনা দেশটির পক্ষ থেকে দেয়াই হয়নি। যে স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশি করোনার নেগেটিভ সনদ নিয়ে যান তারাও ভুয়া সনদ নেননি।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক সময়ে ইতালি যাওয়া কিছু বাংলাদেশি বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকার নিয়ম অনুসরণ করেননি এবং তাদের মাধ্যমেই ভাইরাসটি আরো অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে- এমন আশংকা রয়েছে। গত এক সপ্তাহে ইতালির লাৎজিও অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশির মধ্যে ৬৫৫ জনের করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গত রবিবার বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে ইতালি সরকার লাৎজিও অঞ্চলে বসবাসরত সব বাংলাদেশির (প্রায় ৩০ হাজার) করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর আগে বাংলাদেশ থেকে জাপানে চার্টার্ড ফ্লাইটের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে জাপানে যাওয়া একটি ফ্লাইটে চারজন যাত্রী কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশ থেকে জাপানে রওনা দেয়ার আগে তাদের কাছে কোভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ ছিল। ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজু যাতায়াতকারী চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইট সাসপেন্ড করা হয়েছে জুন মাসের ২২ তারিখে। চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে গুয়াংজু যাওয়ার পর ১৭ জন যাত্রীর দেহে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া কয়েকটি দেশ থেকে আগত যাত্রীদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। যেসব দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার বেশি হচ্ছে, তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। মে মাসের ২৭ তারিখ থেকে জুনের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬৭ জনের দেহে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ২৩ জন বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান থেকে গিয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথাযথ সময়ে যদি আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে না পারি তাহলে আমাদের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হবে। মনে করেন, সৌদি আরব বলল তারা পুরোপুরি করোনায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে, তাদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক; কিন্তু বাংলাদেশ করোনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারেনি। তাহলে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে না। তারা কিন্তু কোনোভাবেই ঝুঁকি নেবে না।’

করোনা ‘নেগেটিভ’ সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় করোনা নেগেটিভ সনদ দেয়া উচিত হচ্ছে না। কারণ সনদ দেয়ার সময় হয়তো তার করোনা ছিল না। কিন্তু যাকে সনদ দেয়া হলো তার বিদেশ যেতে যেতে তিন-চার দিন সময় লেগে গেল। এই সময়ে সে কোনোভাবে সংক্রমিত হতে পারে। ফলে সনদ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই যে সময় ফ্লাইটে উঠবে, সেই সময় তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুস্থ থাকলে পাঠানো উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দোলোয়ার হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে করোনার পরীক্ষা নিয়ে যেসব কাণ্ড ঘটল তার কারণে বিভিন্ন দেশ স্বাভাবিকভাবে আস্থা না রাখার কথা। তবে পরীক্ষা জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশ যে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে এসব দেখার পর যেসব দেশ যোগাযোগ বন্ধ করেছে তারা হয়তো মনোভাব বদলাবে। তবে জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যেন আরো কার্যকর হয় সেই দাবি রাখছি।’

একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘এসব ঘটনায় অবশ্যই আমাদের দেশের ল্যাকিংস আছে। তা না হলে তারা কিভাবে বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে? দেশে জাল করোনা রিপোর্ট দেয়াসহ যেসব ঘটনা ঘটেছে, বিশ্বের দেশগুলো তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে বাংলাদেশিদের ওপর বিভিন্ন দেশের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। করোনায় এমনিতে উন্নত দেশগুলো সংকটের মধ্যে আছে, এর মধ্যে বাংলাদেশিদের ঢুকতে দিয়ে কেউ আর সংকট বাড়াতে চাইছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারের উচিত করোনা সার্টিফিকেটগুলো কাগজে বা হার্ডকপিতে না রেখে সম্পূর্ণ অনলাইনে করে দেয়া। কারণ কাগজে রিপোর্ট দিলে তা ঘষামাজার সুযোগ থাকে। অনলাইনে এমনভাবে রিপোর্ট দিতে হবে, যাতে এনআইডি নম্বর দিলেই রিপোর্ট চলে আসে। এতে একজন প্রবাসী যে দেশেই যাবে সে দেশের ইমিগ্রেশন পুলিশও সহজে তার রিপোর্টটি দেখে নিতে পারবে। এভাবে করলে জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব। যদি এখন থেকেই উদ্যোগ নেয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের বিদেশযাত্রা সুখকর হবে না।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘ইতালি ভ্রমণের জন্য করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট থাকার কোনো নির্দেশনা দেশটির পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। তাই আমরা কোনো করোনা টেস্ট করাইনি, সার্টিফিকেটও নিইনি। এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস এবং ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও যাত্রীদের জন্য কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট লাগবে-এমন নির্দেশনা দেয়নি। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, দেশ থেকে যারা যাবে তাদের কোভিড টেস্ট করে যেতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কোথায় কোভিড টেস্ট করাবে তার তালিকা আমরা হাতে পাইনি।’


Categories