এমপিও নীতিমালার যে ধারা সবচেয়ে হতাশাজনক

প্রকাশিত: ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০

 

আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। আর এই মেরুদন্ড তথা জাতি গড়ার কাজ করেন শিক্ষকরা। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষকদেরকে বিশেষ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তা সত্ত্বেও  বাংলাদেশের বেসরকারি এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা আবহমান কাল থেকেই  বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।সর্বশেষ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা- ২০১৮ এর কতিপয় ধারা/উপধারা শিক্ষকদের বিশেষ করে কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি কলেজের প্রভাষকদের চরম ভাবে হতাশ করেছে। তারমধ্যে সবচেয়ে হতাশাজনক হচ্ছে ১১.৪ ধারা।

 

২০১৮ এর এমপিও নীতিমালার ১১.৪ ধারায় বলা হয়েছে,  “এমপিওভূক্ত প্রভাষকগণ প্রভাষক পদে এমপিওভূক্তির ৮(আট) বছর পূর্তিতে ৫ঃ২ অনুপাতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন। এতে মোট পদসংখ্যা বৃদ্ধি পাবেনা। অন্য প্রভাষকগণ এমপিওভূক্তির ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তিতে বেতন গ্রেড ৯ থেকে ৮ প্রাপ্য হবেন।…”

এ নতুন বিধির ফলে একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মাত্র ২৮% প্রভাষক ৮ বছর পূর্তিতে পদোন্নতি পেয়ে ৬ষ্ঠ গ্রেডে উন্নীত হবেন, তাদের আর্থিক সুবিধা বাড়বে ১৩,৫০০ টাকা।আর বাকি ৭২% প্রভাষক সারাজীবন একই পদে অবসরে যাবেন। পদোন্নতি বঞ্চিত প্রভাষকরা ১০ বছর পর  ৮ম গ্রেড পাবেন। এতে তাদের আর্থিক সুবিধা বাড়বে মাত্র ১ হাজার টাকা । একই যোগ্যতায় , একই পদে চাকুরি করে ভাগ্যগুণে কারো ৮ বছর পর  পদোন্নতি সহ ১৩৫০০ টাকা বেতন বৃদ্ধি হবে , পক্ষান্তরে অধিকাংশ প্রভাষকের ক্ষেত্রে সারাজীবন পদোন্নতি তো হবেইনা বরং আরো ২ বছর বেতন বৃদ্ধি হবে মাত্র ১ হাজার টাকা!

এ রকম বৈষম্যমূলক আইনের প্রতিবাদে  পদোন্নতি বঞ্চিত প্রভাষকরা সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেছেন।বিশেষ করে ১০ বছরে মাত্র ১ হাজার টাকা বৃদ্ধির নীতিমালাকে তারা হতাশাজনক ও অপমানজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন।অথচ ১৯৯৫ এর নীতিমালা অনুযায়ী প্রভাষকরা ২ বছর পূর্তিতে ৮ম  এবং ৮ বছর পূর্তিতে ৭ম প্রেড পেতেন।২০১০ এর এমপিও নীতিমালায় ২ বছর পর ৮ম গ্রেডের বিধান পরিবর্তন করলেও ৮ বছর পর ৭ম গ্রেড বহাল রাখা হয়।(এমপিও নীতিমালা ২০১০, ধারা ১১,.৪)।

 

দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন- বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজে অনুপাত প্রথার অস্তিত্ব নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বীকৃত কোনো জার্নালে প্রকাশনা থাকতে হবে। অন্যদিকে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভাগীয় পরীক্ষায় পাসের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

জাতীয় শিক্ষানীতির শিক্ষা প্রশাসন অধ্যায়ের ৬৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যোগ্যতার নিরিখে (উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন, মৌলিক গবেষণা কর্ম, শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নয়ন ইত্যাদি) প্রতিযোগিতামূলকভাবে উচ্চতর পদে নিয়োগ প্রদান করা হবে, যেমন- প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে। বেতন বৃদ্ধি সফল প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। বৃহত্তর পরিসরে শিক্ষকদের মৌলিক সুবিধাদি নিশ্চিত করে অন্যান্য সুবিধাদি অর্জিত যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হবে।“ তাই শুধুমাত্র এমপিওভূক্ত প্রভাষকদের ক্ষেত্রে অনুপাত প্রথার ভিত্তিতে পদোন্নতির বিধান শিক্ষাক্ষেত্রে শুধু বৈষম্যই বৃদ্ধি করবেনা বরং মেধাবীরা এ পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবে।এতে করে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হবে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে গত ৯ জুলাই এমপিও নীতিমালা-২০১৮ সংশোধনী চুড়ান্তকরণের ভার্চুয়াল সভা অনুস্টিত হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে আগামীকাল ১৩ জুলাই নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রী সহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল নীতি নির্ধারকের কাছে আকুল আবেদন, মেধাবীদের শিক্ষায় আকৃষ্ট করে শিক্ষার যথাযথ মান নিশ্চিতকল্পে আগামীকালের সভায় এমপিও নীতিমালা ২০১৮ এর ধারা ১১.৪ বাতিল তথা অনুপাত প্রথা ও ১০ বছরে ৮ম গ্রেড রহিত করে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর সকল প্রভাষককে ধাপে ধাপে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুস্পষ্ট বিধান সংযোজন করুন।

 

লেখক: এম.এ.মতিন. প্রভাষক ও শিক্ষক সংগঠক

মতামত লেখকের নিজস্ব। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

 


Categories