ঢাকা, ৫ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ৯ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

এমপিও নীতিমালায় যেসব বিষয়ে সংশোধনী আসছে


প্রকাশিত: ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২০

গ্রামের বেসরকারি শিক্ষায়তনের এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও পাশের হারের শর্ত অনেকটা শিথিল করা হয়েছে। চাকরির ১০ বছর পূর্ণ হলে ১০০ নম্বরের সূচকের যোগ্য প্রভাষকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরমধ্য দিয়ে প্রথম বারের মতো বেসরকারি শিক্ষকদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) চালু হতে যাচ্ছে। এছাড়াও ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্কুল ও কলেজ জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ বেশ কিছু সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে গতকাল মঙ্গলবার বিকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কয়েক ঘন্টব্যাপী অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল সভায় এসব সিদ্বান্ত হয়েছে। আরেকটি সভা করে নীতিমালার সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।সভার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে নীতিমালা সংশোধন কমিটির আহ্বায়ক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) মোমিনুর রশিদ আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নীতিমালা কমিটির সদস্য ও নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার জানান , বর্তমান নীতিমালায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে শহর ও মফস্বলের প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৭০ শতাংশ ছিল। মফস্বলের ক্ষেত্রে তা কমানো হয়েছে। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিতে ১০০ নম্বরের সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। আরেকটি সভা করে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।

নীতিমালা সংশোধন কমিটির সভায় অংশ নেওয়া একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে বর্তমান নীতিমালার কঠিন শর্ত অর্জন করা দুস্কর। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নীতিমালা অনুযায়ী বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। যে কারণে শহর ও গ্রামের প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্য দূর করতে গ্রাম ও শহর ভেদে কাম্য শিক্ষার্থী ও পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।

সভা সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন এলাকায় বিভক্ত করা হয়েছে। যথাক্রমে সিটি কর্পোরেশন, পৌর সভা ও মফস্বল এলাকা। নিম্ম মাধ্যমিক স্তরের (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম) প্রতিটি শ্রেণিতে ৪০ জন করে শিক্ষার্থী থাকতে হবে। একটি শ্রেণিতে ৮০ জন শিক্ষার্থী হলে নতুন শাখা খুলতে পারবে। মাধ্যমিক স্তরে প্রতি শ্রেণিতে ৪০ জন করে শিক্ষার্থী থাকতে হবে। সিটি কর্পোরেশন এলাকার উচ্চমাধ্যমিক স্তরে তথা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার প্রতি বিভাগে ৫০ জন করে মোট ১০০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। একই স্তরের মফস্বল এলাকায় প্রতি শ্রেণিতে ৪০ জন করে মোট ৮০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। পাবলিক পরীক্ষায় ৩৫ জন শিক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করতে হবে। মফস্বল এলাকার বিজ্ঞান বিভাগে প্রতি শ্রেণিতে ৩০ জন করে শিক্ষার্থী থাকতে হবে।

সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নিম্ম মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশ, পৌর এলাকায় ৬০ ও মফস্বল এলাকার প্রতিষ্ঠানে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী শিক্ষার্থীদের ৬৫ শতাংশ, পৌর এলাকায় ৬০ ও মফস্বল এলাকার প্রতিষ্ঠানে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করতে হবে। আর ডিগ্রি স্তরে সিটি কর্পোরশেন এলকায় ৫৫ শতাংশ, পৌর এলাকায় ৫০ শতাংশ ও মফস্বল এলাকায় ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করতে হবে। ভাড়া বাসা-বাড়িতে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে না।

বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, প্রভাষক পদে এমপিওভুক্তির আট বছর পূর্তিতে ৫:২ অনুপাতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। এই শর্তের কারণে অনেক প্রবীন শিক্ষক চাকরি থেকে অবসরে গেলেও সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। অনেক প্রবীন প্রভাষকের ছাত্রও নতুন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাষক পদে চাকরি নিয়ে সহকারী অধ্যাপক হয়ে যাচ্ছেন। বহু বছর ধরে এই অনুপাত প্রথা তুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন শিক্ষকরা। শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপকের বহু বছরের অনুপাত প্রথা শিথিল করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালা জারির পর চাকরির ১০ বছর পূর্তি হলেই কর্মরত প্রভাষকদের অর্ধেক সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন। তবে সেক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে চাকরিতে জ্যেষ্ঠতার জন্য ১৫ নম্বর, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত হাজিরার জন্য ১০ নম্বর, এসিআরের উপর ১০ নম্বর, উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ১০ নম্বর, গবেষণাসহ বিভিন্ন যোগ্যতার ওপর মোট ১০০ নম্বর যোগ্যতার সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি চূড়ান্ত করতে একটি সাব কমিটি করে দিবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটি যোগ্যতার সূচক নির্ধারণ করে দিবে। এরমধ্য দিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসিআর চালু হতে যাচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, উচ্চমাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ পদ শুন্য হলে একই কলেজের কোন শিক্ষক অধ্যক্ষ হতে পারবেন না। ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপকরা অধ্যক্ষ হতে পারবেন। ইন্টারমিডিয়েট কলেজে নতুন করে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি না দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব কলেজে সিনিয়র প্রভাষক পদ সৃষ্টি করা হবে। বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স স্তরের শিক্ষকদের জনবল কাঠামোভুক্ত করতে আর্থিক বিষয় জড়িত থাকায় অর্থমন্ত্রণালয়ের পরামর্শে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এসব কলেজে সহযোগী অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। চারুকারু ও কৃষিশিক্ষা ছাড়া অন্য বিষয়ে বিএড ডিগ্রি ছাড়া কেউ বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক হতে হতে পারবেন না। শিক্ষা জীবনে তৃতীয় বিভাগধারী কেউ প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ হতে পারবে না। নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী গ্রন্থাগারের নতুন পদটি জনবল কাঠামোতে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালায় আর্থিক বিষয় জড়িত থাকায় অর্থ ও জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত অক্টোবর মাসে ২৭৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত ঘোষণা করা হলে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট হয়।

শিক্ষকরা নীতিমালার ভুলত্রুটি নিয়ে আন্দোলন শুরু করলে এবং গণমাধ্যমে ক্রমাগত লেখনির ফলে  দীপু মনি এমপিও নীতিমালা সংশোধন করার ঘোষণা দেন। গত ১২ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) মোমিনুর রশিদ আমিনকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্য বিশিষ্ট এমপিও নীতিমালা সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে একমাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে সময় বেধে দেওয়া হলেও নয় মাস লেগে যায়।

সুত্র: দৈনিক আজকালের খবর