এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের সরল সমীকরণ- মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।

প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০২১

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের সরল সমীকরণ।

লেখক- মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।

একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। একথা অনস্বীকার্য যে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুনগত মানের শিক্ষার বিকল্প নেই। বিশ্বময় এখন ধারণা পাল্টেছে,শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, যে জাতি যতো বেশি শিক্ষিত, সেই জাতি ততোই উন্নত। তারই ধারাহিকতায় বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে করণীয় বিষয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বের চিন্তা ভাবনা করেছে এমনটা কেউই মনে করেনা। দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা বিশৃঙ্খলভাবে বিভিন্ন ধারার চলছে। প্রাথমিক শিক্ষা সরকারিকরণ করা হলেও মাধ্যমিক শিক্ষার ৯৭% বেসরকারি বাঁ এমপিওভুক্ত। এসব এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের যৌক্তিকতা আমাদের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনার উন্মেষ শুরু হয় ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন ও ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। জনগণের কল্যাণ চাইলে বহু পূর্বেই এদেশের রাজনীতিবিদের উচিত ছিল দেশের বিশৃঙ্খল এমপিওভুক্ত শিক্ষাব‍্যবস্থাকে সরকারিকরণ বা জাতীয়করণ করা। মহান স্বাধীনতা পরবর্তী  শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বিগত সরকারগুলো। দেশের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান মর্যাদা ও বেতন-ভাতার দাবি কারোর দয়া দাক্ষিণ্যের বিষয় ছিল না। অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষায়ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দক্ষ সৃজনশীল মানবসম্পদ গড়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়। মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধানতম সোপানটি হলো- শিক্ষা। পৃথিবীর অনেক দেশে শিক্ষা দফতর বা মন্ত্রণালয়কে মানবসম্পদ দফতর বা মন্ত্রণালয় বলে অভিহিত করা হয়। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে বিগত সরকারগুলোর অবহেলা উদাসীনতা, দুর্নীতি ও অব‍্যবস্থাপনার কারণেই আজ সামগ্রীক শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানের এই নিম্মমূখী বিপর্যস্ততা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সুষ্ঠু নজরদারির অভাব, বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠা শিক্ষার মাধ্যমে যে মানব সম্পদ তৈরি হচ্ছে, তাদের দক্ষতার ভিন্নতা, মানের নিম্নমুখীতা প্রকট হয়ে দৃশ্যমান। দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা বঙ্গপোসাগরে নিক্ষেপ করার কথা উঠেছে। মানসম্মত শিক্ষা ব‍্যতিত দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার মতো অত্যন্ত আবশ্যকীয় ও মৌলিক বিষয়টি নিয়ে চলছে চলছে চরম উদাসীনতা নানাবিধ অবহেলা দূর্নীতি ও দুষ্ট বাণিজ্য। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, বৈষম্যদূরীকরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এই চারটি মূলনীতি অনুসৃত হবে। এই মূলনীতি বিশ্লেষণে দেখা যায় , স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের বাইরে থাকা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাটিই ছিল সাম্যকে কেন্দ্র করে। পরাধীন বাংলার বৈষম্যে দূর করতে এদেশের মানুষ সাম্যের প্রতিষ্ঠায় মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎযাপন করছি, কিন্তু আজও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য রয়েই গেছে। আক্ষরিক অর্থে শিক্ষাকে পণ্য বাণিজ্যের আকর্ষণীয় উপাদানে পরিণত করা হয়েছে। দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭.৫৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত। অপরদিকে ২.৩৬ শতাংশ মাত্র সরকারি। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের সকল বিধিমালা নিয়মনীতি মেনেই পরিচালিত হয়। সরকারি প্রজ্ঞাপন নীতিমালা পাঠ‍্যক্রম, পাঠ‍্যসুচী, কর্মঘন্টা, পাঠ‍্যপুস্তক, পরিক্ষা পদ্ধতি, সনদের মান একই। মাধ্যমিক, মাদরাসা, উচ্চ মাধ্যমিক, এবং কারিগরি এই চারটি স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত। এসব এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ১০০-৩০০ টাকা মাসিক বেতন দিয়ে লেখা পড়া করতে হয়। এতে দেশের প্রান্তিক হতদরিদ্র অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষার ব‍্যয় নির্বাহ করতে পারছেনা। ফলে অর্থাভাবে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই পরবর্তীতে সামাজে নানাবিধ অন‍্যায় অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। শিক্ষাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরাই ইভটিজিং ও মাদকাসাক্ত হয় পড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে এখনই সময়, একযোগে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ করা।

স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করা। শিক্ষা জাতীয়করণের লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রথমেই একযোগে বিধ্বস্ত দেশের ৩৭ হাজার  প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করেন। তিনি ধাপে ধাপে সমগ্র বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং সেলক্ষ্যে তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মাসিক ২৫-৭৫ টাকা বেতন ও রেশনিংয়ের ব‍্যবস্থা করেছিলেন। জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা সরকারের চলতি মেয়াদেই জাতীয়করণ করতে হবে।দেশের সাধারণ মানুষের ঘামে ভেজা শিক্ষা কর এর টাকায় তাদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় রাস্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ কর। দেশ এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী। যেহেতু এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধ নেই, সেহেতু প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার। এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা বেসরকারি রেখে মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মানুষকে বিত্তবান করার হীন প্রতিযোগিতা চলছে। এতে বঞ্চিত ও বিক্ষুব্ধ হচ্ছে শিক্ষকরা ও অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হতদরিদ্র অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের।

শিক্ষা আদান-প্রদান একটি জটিল প্রক্রিয়া। এখানে শিক্ষকগণই গুরুদায়িত্ব পালনকারী। বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাবে শিক্ষক শিক্ষার্থী সবাই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত। এমনি সময় শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রতি বিনম্র অনুরোধ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিদ্যমান সকল বৈষম্যের দূরীকরণ করুন। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের জোর দাবি জানাচ্ছি। শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টায় মহান জাতীয় সংসদেও জাতীয়করণের দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে বারবার শিক্ষকদের শ্রেনীকক্ষের বাহিরে টেনে আনা উচিত হবে না। দেশপ্রেমিক মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ মানসম্মত দক্ষ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি ব‍্যতিত চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উত্তরণ ও এসডিজি লক্ষ্য অর্জন করা কঠিনতর হতে বাধ্য। দেশের হতদরিদ্র, অসচ্ছল, অবহেলিত জনগোষ্ঠির সন্তানদের সরকারি খরচে শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের কোন বিকল্প নেই। জাতি গঠনের নিপুণ কারিগর শিক্ষকদের বিক্ষুব্ধ করে, বৈষম্য সৃষ্টি করে, অসম্মান, অমর্যাদা করে তাদের কাছ থেকে কাংখিত সেবা পাওয়ার প্রত‍্যাশা করা অবান্তর। সকল শ্রেনীপেশার মানুষের যৌক্তিক দাবি, এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করে এ দেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠির সন্তানদের স্বল্পব্যয়ে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে দেশের বিশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন সহ ধারাবাহিক সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে বলেই বিশ্বাস করি।

লেখকঃ
মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম।


Categories