এমএসসি পাস; অথচ সংসারের একটা ছোট্ট অংক মিলাতে পারেন না

প্রকাশিত: ৬:২৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

মহান পেশা শিক্ষকতার সম্মানের তকমা শোনতে শোনতে আকাশ ছোয়া চাকরির প্রতিযোগিতার এ দেশে লক্ষ লক্ষ চাকরি প্রার্থীর সাথে প্রতিযোগিতায় জাতীয়ভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিজের স্থান দখল করে বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে সম্মানের অার কুলকিনারা খুজে পাচ্ছেন না বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাস করা বেসরকারি স্কুলের সদ্য শিক্ষক৷ ক্লাশরোমে শিক্ষার্থীদের নিকট গণিতের জাদুকর শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করতে পারলেও জীবনের হিসাব মেলাতে তিনি সম্পূর্ণ কাচা৷ তিন হাজার একশত পঁচিশ টাকার ছোট্ট একটা হিসাব সংসাদের সদস্যদের আনন্দের সাথে টাকা ব্যয়ের হিসাব তিনি সহজে মেলাতে পারেন না৷
হ্যাঁ, এনটিঅারসিএ কর্তৃক মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা একজন এমএসসি পাস মেধাবী যু্বক এনটিঅারসিএ কর্তৃক সুপারিশ পেয়ে রাজশাহী থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লার একটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে মহান পেশার মহান ব্যক্তি হিসেবে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে পরিচিত হয়েছেন বাংলার এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী চাকরির জগতের সাথে৷ ১২ হাজার পাঁচশত টাকা বেতনের চাকরিতে এক হাজার টাকায় বাড়ি পান৷ এটা পেয়েও তিনি মাঝে মাঝে অানন্দ ও কষ্টের মধ্যে চেপে থাকা একটা চাপা হাসি দেন৷ কারণ একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষের বাড়ি ভাড়া যতো সে প্রতিষ্ঠানের অায়ার বাড়ি ভাড়া ততো৷ এ কথাটা মনে হলেই আনন্দ-দু:খের হাসিটা তার ঠোটের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে অাসে৷ এ এক হাজার টাকা দিয়ে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে থাকার জন্য একটি এক কক্ষ বিশিষ্ট বাসা গ্রামের প্রতিটি অানাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে কোথায় কাউকে ভাড়া দেবার কথা সাহস করতে পারেন নাই তিনি; মিনি শহর কিংবা উপজেলার অাশেপাশের স্থানের দৃশ্য ঘুমিয়েও স্বপ্ন দেখেন না৷
মুসলিম হিসেবে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠ উৎসব ঈদুল অাযহা ও তাঁর চাকরি জীবনের প্রথম উৎসব পালন করতে গিয়ে গত বছর দারুনভাবে নিজকে নিজে অপমানিত করতে হয়েছিল৷ নতুন চাকরি পেয়ে কোরবানির একটা শরীক হতে পুরো একমাসের মাসিক বেতনসহ উৎসব ভাতার বিসর্জন দিতে হয়েছিল৷ মসলা কেনার টাকাটা অবশেষে কর্য করতে হয়েছিল তার৷ কর্মস্থলে ফেরার পথে ভাড়ার টাকা না থাকায় লজ্জার সবটুকু হারিয়ে বৃদ্ধ বাবার কাছ থেকে ভাড়ার টাকা নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার মাধ্যমে৷
এবার অন্যরকমের ঈদ৷ সন্তান একটু বড় হয়েছে৷ নতুন জামা চাইতে শিখেছে৷ দুই বাবাকে কিছু দিতে পারলে তিনি বেজায় খুশি৷ স্ত্রী স্বামীর সব হিসাব দেখতে পেয়ে শুধু ঈদ নয় সারা বছরই জামার কথা ভুলে থাকেন৷ করোনা মহামারীতে দীর্ঘদিন ঘরে আটকিয়ে থাকা শিক্ষক এবার চরম হিসাব কষতে হচ্ছে দুই বাবাকে নিয়ে৷ উৎসব ভাতা হিসেবে তার ব্যাংক একাউন্টে জমা হবে তিন হাজার একশত পঁচিশ টাকা৷ সে টাকাও সময়মত পাবেন কিনা তা নির্ভর করে ব্যাংকের মর্জির ওপর৷ মনে মনে ভাবছেন করোনা মহামারীর কথা বলে সন্তানকে জামা চাওয়ার কথাটা হয়ত চুপ করিয়ে দেবেন৷ কিন্তু পরবর্তী ঈদেও কি করোনা থাকবে?
উৎসব ভাতা কাকে বলে? চাকরীজীরা কোন নিয়মে এ ভাতা পেয়ে থাকেন? উৎসব ভাতা বলতে মুল বেতনের সমপরিমাণ এক মাসের বেতন বুঝালে তার বেলায় কেন ২৫% পাবেন? তবে কি শিক্ষক হবার কারণে? বাংলার মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় শিক্ষকতা মহান সম্মানের পেশা! তবে শিক্ষকের নিজ গৃহে সম্মান কোথায়? ঈদে বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তানদের কিছু কিনে দিতে না পারলে সংসারে সম্মান থাকে নাকি? তিন হাজার টাকায় কাকে কী দেয়া যাবে? সরকারি অফিসের ৮ম শ্রেণি পাস নৈশ প্রহরির উৎসব ভাতাও এমএসসি পাস শিক্ষকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ! দোকানদার দু’জন ব্যক্তির সন্তানের জন্য একই জামা ভিন্ন ভিন্ন দামে দিবে তো? শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকদের কাছ থেকে ২৫% দামে ঈদ পণ্য কেনার জন্য সরকার দোকানীদের নির্দেশ দিয়েছেন তো?
সারা বছর মাসিক অনুদানের টাকা দিয়ে অংকে কাচা ছাত্রের মতো কোনো রকম দিন কাটিয়ে দেন; কিন্তু ঈদ অাসলে তিনি হিসাব অার মেলাতে পারেন না৷ এমএসসি পাস গণিতের শিক্ষক শ্রেণি কক্ষে অংকের ম্যাজিক হিসেবে খ্যাতি পেলেও ঈদ বোনাসের তিন হাজার একশত পঁচিশ টাকার হিসাব সংসারে মেলাতে পারেন না৷ এখানে তিনি অংকে খুবই কাঁচা! চাকুরে ছেলের কাছে ঈদ অাসলে বাবা মায়ের একটা স্নেহের চাহিদা থাকারই কথা৷ স্ত্রী-সন্তানদেরও নতুন জামা পাওয়ার উল্লাস কম থাকে না৷ ২৫% উৎসব ভাতার টাকায় কাকে কী দেয়া যাবে সে হিসেবটা মিলিয়ে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি৷
পৃথিবীর সব কিছু পরিবর্তন হয়েছে৷ হাজার টাকার মানুষ কোটিপতিতে রূপান্তরীত হয়েছে, সরকারের অনেক নতুন নতুন দফতর সৃষ্টি করে নতুন জনবলের কর্মসংস্থান হয়েছে, টিনের চালার স্কুলে চারতলা ভবনে উন্নীত হয়েছে, শ্রেণি কক্ষগুলো মাল্টিমিডিয়া ক্লাশে পরিণত হয়েছে, বৃত্তি-উপবৃত্তি দ্বিগুণ হয়েছে, বিনা মূল্যে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পৌছেছে, স্কুলের কর্দমাক্ত রাস্তাগুলো পাকা রাস্তায় উন্নীত হয়েছে, শিক্ষার্থীদেরকে স্কুল ড্রেসের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে, বড় বড় কর্মকর্তাদের যাতায়তের জন্য অাধুনিক গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে, ছোট্ট ছাত্রটি নেতায় পরিণত হয়েছে, শুধু শিক্ষকদের উৎসব ভাতার হারটিই কেবল গত ১৬ বছর যাবত একই রয়ে গেছে৷ বিশাল অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেলের প্রিয় জন্মভূমি স্বাধীন বাংলাদেশে ২৫% উৎসব ভাতা ১৬ বছর পার হয়েও কেন অার উন্নীত হচ্ছে না? জানার ইচ্ছা রয়েই যাচ্ছে!
লেখক- মোহাম্মদ মহসিন মিয়া
সহকারী প্রধান শিক্ষক

Categories