ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ আসাদের চেতনা হোক চির অম্লান

প্রকাশিত: ৬:২২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২১

আজ ২০ জানুয়ারী ” শহীদ আসাদ দিবস” । আজ হতে ৫২ বছর পূর্বে তৎকালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান আসাদ। স্বৈরাচার আইয়ুব শাহীর পতন ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক রক্তচক্ষু পুলিশের গুলিকে উপেক্ষা করে আন্দোলন সংগঠিত করেন শহীদ আসাদ । আসাদ ছিলেন একজন সংগঠক ও দেশ প্রেমের চেতনার নাম । একজন সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে লোকজনকে সংগঠিত করেন স্বাধীকার আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে ।মাতৃভূমির প্রতি আসাদের এই নিখাদ প্রেম অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে শহীদ আসাদের দেশ প্রেম অনুসরণ অনুকরণ করা খুবই প্রয়োজন।

১৯৬৯ সনের ২০ জানুয়ারি আসাদের রক্তে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের অগ্নি স্ত্রোত প্রবাহিত হয়। এক‌ই সাথে ২৪ জানুয়ারি বাংলা মায়ের আদরের দুলাল মতিউর, মকবুল ও আলমগীরের রক্ত মিশে সৃষ্টি হয়েছিল রক্তের মহা কল্লোল। বেগবান হয়ে যায় আমাদের স্বাধীনতা আদায়ের পথ। কুচক্রী পাকিস্থানী শোষকদের ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা দ্বারা বঙ্গবন্ধুকে তারা ফাঁসি দেওয়ার পাঁয়তারা ও কুমতলব করেছিল আসাদের রক্ত রঞ্জিত কম্পনে সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ ও ধূলিসাৎ করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার প্রদীপ্ত শপথ নিয়েছিলো আসাদরা । সারা দেশ মিছিল, জনমিছিল, আর মশাল মিছিলে ছেয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি মিছিলে প্রকম্পিত শ্লোগান হয়েছিল-জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো। আইয়ুব শাহি নিপাত যাক, গুন্ডাশাহি ধ্বংস হোক। মিছিলকারীদের চোখে মুখে ছিল আসাদের রক্তের বিনিময়ের প্রতিশোধ গ্ৰহণের বজ্র স্পৃহা। আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না, । এমনি গগণ বিদায়ীশ্লোগান ও জনরোষের মুখে কিছুদিনের মধ্যেই কুখ্যাত লৌহমানব স্বৈরাচারী আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আইয়ুব খা নিজেকে রক্ষার্থে কোন পথ না পেয়ে এদেশে সামরিক শাসন জারি করে। রেখে যায় আরেক মদ্যপ ইয়াহিয়া খান কে। জেনারেল ইয়াহিয়া দুর্দান্ত প্রতাপ নিয়ে তাদের গদি ঠিক রাখতে বাঙালি নিধনের পথ বেঁছে নেয়।

পাকিস্তান নামক শাসন যন্ত্রটি ১৯৪৭ সাল থেকে বাংলাদেশে তাদের শোষণ পরিচালনা করতে থাকে। বাংলা ছিল তাদের অত্যাচারও জুলুম নির্যাতনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার স্বাদ গ্ৰহণের জন্য দেশের মানুষ তখন অধির আগ্ৰহ ও আশার স্বপ্নে বিভোর ছিল। তারা পেতে চেয়েছিল অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বাধীন জীবন। কিন্তু ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানীরা বাঙালি জাতীকে আষ্টে পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। এ দেশীয় কিছু কুলাঙ্গার সন্তানদের সহায়তা তারা পেয়ে আসছিল।
পাকিস্তানের সকল কুমতলব ছিন্ন করে বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাসে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরব ছড়ানো উপখ্যান। আর ৬৯এর গণ অভ্যুত্থানের এক উজ্জ্বলও প্রদৃপ্ত নায়ক আমাদের শহীদ আসাদ।
আসাদুজ্জামান আসাদ ১৯৪২ সালের ১০ জুন জন্ম গ্ৰহণ করেন নরসিংদী জেলায়। তাঁর সুযোগ্য পিতা শিবপুর তথা নরসিংদীর শ্রদ্ধেয় জন আলহাজ্ব মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের বিএ বিটি। ঐতিহ্যেপূর্ণ হাতিরদিয়া সাদত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় সেখানে আসাদের জন্ম হয়। তাঁর মা মরহুমা মতিজাহান খাদিজা খাতুন ছিলেন শিক্ষিকা। মা নারায়ণগঞ্জে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আসাদ ছোট কাল থেকেই নিপীড়িত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আনয়নে উদগ্ৰীব হয়ে পড়েছিলেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত হয়ে যান। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অধিকার বঞ্চিত মানুষের জন্য তাঁর মন কাঁদতো। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিজ এলাকায় শিবপুরে কৃষক সংগঠন করে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে পরবর্তীতে শিবপুর, মনোহরদী, রায়পুরা ও নরসিংদী এলাকায় শক্ত কৃষক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। তিনি এ এলাকার বহু সফল হরতালের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষে ১১দফা দাবীর কর্মসূচি নিয়ে ছাত্র সংগ্ৰাম পরিষদ তখন সারা বাংলায় ছড়িয়ে যায়। সমগ্ৰ বাংলাদেশ এ দাবীর সমর্থনে ব্যাপক সাড়া দেয়। ১১ দফা কর্মসূচি প্রথম আরম্ভ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র সমাবেশ আহবান করা হয়েছিল। তখন রাস্তায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পরের দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গকরে ছাত্ররা রাস্তায় মিছিল করে করলে তাদেরকে পুলিশ বাঁধা দেয় ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ১৯ জানুয়ারি আবারও মিছিল বের হলে পুলিশ বাঁধা দেয় ও গুলি করে। এরপর দিন ২০ জানুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের হলে পুলিশ চানখারপুল এর মোড়ে অবস্থান নিয়ে তাদের জীপ থেকে বাংলা মায়ের দামাল ছেলে আসাদকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়লে আসাদ শাহাদাত বরণ করেন। আসাদ শহীদ হবার পর এ খবর দাবানলের মত সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। ঊনসত্তর রুপ পায় অগ্নি স্ফূলিঙের। সারা দেশ হয় উত্তাল।
শহীদ আসাদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে আজ আমাদের দেশ স্বাধীন। আমরা এখন সার্বভৌম জাতি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্জন এখন বিশ্বের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর সাহসী নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পেরেছি। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আসছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে ও তার অর্জনে যাঁরা তাদের তাজা জীবন উৎসর্গ করেছেন, শহীদ হয়েছেন তাদের ঋণ অপরিশোধ্য । আজকের দিনে শহীদ আসাদ সহ সকল শহীদদের জন্য মহান রবের নিকট জান্নাত প্রার্থণা করি ।
আব্দুল জব্বার
উপসম্পাদক
দৈনিক আমাদের ফোরাম