উপেক্ষিত শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হিমাগারে। মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।

প্রকাশিত: ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০২১

উপেক্ষিত শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হিমাগারে। মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।

যে কোন জাতির শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। কাজীর গরু বালামে আছে, গোয়ালে নেই। নীতি আছে, প্রয়োগে নেই। যথেচ্ছাভাবে চাপিয়ে দেয়া বিতর্কিত এক শিক্ষাব্যবস্থা জাতির ঘাড়ের ওপর চেপে বসেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এর সদিচ্ছায় দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হলো শিক্ষানীতির মাহত্ব্য।
২০১০ সালে মহান সংসদে অনুমোদিত জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ আমজনতাকে বুঝিয়েছেন এটি সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাস্তবতা হলো আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বিগত দশ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের অপরিহার্যতা ছিল একটি শিক্ষা আইনের, তাও করতে পারেনি শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রনালয় বিগত দশ বছরের কোনো বাজেটেই বাড়তি বরাদ্দ রাখেনি বরঞ্চ শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে। শিক্ষানীতিতে সকল স্তরের শিক্ষকদের সতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদানের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। কার্যত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতিকে পাশ কাটিয়ে জোড়াতালি দিয়ে ও নির্বাহী আদেশে পরিচালিত হচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক প্রভুত্ববাদী মনোভাব, আকাশ ছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পদে পদে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নিন্মোক্ত কারণে সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ ক্রমান্বয়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে।
এক। 
বিগত ১০ বছর ধরে শিক্ষা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াই চলছে। এটা এখন নিশ্চিত যে, এই সরকারের মেয়াদে শিক্ষা আইন তৈরির সম্ভবনা নেই। দেশ স্বাধীনতা পরবর্তী আটটি শিক্ষা কমিশন ও কমিটি গঠন হলেও জাতীয় শিক্ষানীতি’১০ ব‍্যতিত অন্যান্য গুলো হয় সরকার পরিবর্তনের কারণে, অথবা বিরোধিতার মুখে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ধারাবাহিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে এই শিক্ষানীতিটি বাস্তবায়নে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল বর্তমান সরকার। অথচ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং সমন্বয়হীনতার অভাব, নীতিনির্ধারকদের বৈরী মনোভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শিক্ষানীতি-১০ বাস্তবায়ন আলোর মুখ দেখেনি। অথচ প্রনয়নকৃত শিক্ষানীতি-১০ বাস্তবায়নে একটুখানি আন্তরিক হলে, শিক্ষাক্ষেত্রে অনন‍্য অবদানের জন্য বর্তমান ধারাবাহিক সরকার প্রশংসিত হতে পারতো, ইতিহাস সৃষ্টি হতো।
দুই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সদিচ্ছায় জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০০৯ সালে ৮ই এপ্রিল শিক্ষানীতি প্রণয়নে কমিশন গঠন করা হয়। ১৮ সদস্যের সুপারিশে শিক্ষনীতি’২০১০ মে মাসে মন্ত্রিসভায় এবং ১৯শে ডিসেম্বর মহান সংসদে অনুমোদিত হয়। ২০১১’র জানুয়ারিতে জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৬টি সাবকমিটি গঠন করলেও বেশিরভাগ কমিটি কোন কাজ করেনি। কেন সাব-কমিটিগুলো কাজ করেননি? সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোন কৈফিয়ত তলব বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি।
তিন
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষানীতিতে বলা হলেও বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রণীত শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সালের মধ্যেই দেশের সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণী থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিশ্চিত করার সুপারিশ ছিলো। সদিচ্ছার অভাবে আলোর মুখ দেখেনি এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি। ২০১৬ সালে শিক্ষামন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ঘোষণা দেয়, প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার, অথচ বাস্তবায়নের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই।
চার।
শিক্ষানীতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে দুটি আলাদা অধিদপ্তর যথাক্রমে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর করার কথা বলা ছিল। দৃশ্যত বাস্তবায়নের অগ্রগতি কোনটিই নেই।
পাঁচ।
জাতীয় শিক্ষানীতির ঘোষণানুযায়ী, সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য সতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা বলা হলেও বাস্তবে কোন পদক্ষেপ নেই। উপরন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের যৌক্তিক প্রাপ‍্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে নতুনভাবে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ এই এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাই দেশের ৯৭% শিক্ষার গুরুদায়িত্ব পালনকারী। বঞ্চনা ও বৈষম্যে নিমজ্জিত রেখে শিক্ষকদের মনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করা হয়েছে এর ফলে শিক্ষার মানোন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৈকি। সর্বমহল থেকে দাবি উঠেছে, শিক্ষাকে এমপিও খাতে না রেখে সকল এমপিওভুক্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে জাতীয়করণের। জাতীয়করণের বিষয়টি সবার জ্ঞাত থাকার পরও অদৃশ্য কারণে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের বিষয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
ছয়।
জাতীয় শিক্ষানীতি-১০ আলোকে দেশে একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আদৌও এজাতীয় কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি।
সাত।
শিক্ষার মানোন্নয়নে গুনগত মেধাবী শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে শিক্ষানীতিতে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে পিএসসির আদলে শিক্ষা কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। বিধিবাম নিরব নিস্তব্ধ মন্ত্রনালয়।
পরিশেষ মূল্যায়ন হলো, দশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ও শিক্ষানীতির মূল বিষয়গুলোই বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষানীতির অনেকগুলো বিষয় বাস্তবায়নে শিক্ষা আইন অপরিহার্য ছিল। রহস্যজনক কারণেই শিক্ষা আইনের খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়নি। শিক্ষা আইন প্রণয়নে গঠিত কমিটি বিগত দশ বছর শুধু খসড়ার কাটা ছেঁড়া করেছেন, উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। ধারাবাহিক সরকারের সদিচ্ছায় প্রণিত একটি শিক্ষানীতি উপেক্ষিত হয়েছে শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। তাঁরপরও জাতির প্রত্যাশা আগামী প্রজন্মকে মানসম্মত শিক্ষাদানে সক্ষম হবে আমাদের অভিজ্ঞ ও মেধাবী শিক্ষকগন। এমপিওভুক্ত শিক্ষার সকল বৈষম্য ও সমস্যার সমাধান করে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত মানের সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়।
মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম।

Categories