ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য

প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২০
        লেখক :  মুফতী মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম নদভী
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যত উত্তম ও মধুর হবে, দাম্পত্য জীবনে সুখ ও শান্তি তত বেশী বৃদ্ধি পাবে। তাদের মাঝে সম্পর্ক উত্তম ও মধুর করতে ইসলামে রয়েছে বিশেষ দিক নির্দেশনা। স¦ামী ও স্ত্রী একে অন্যের সহায়ক ও পরিপূরক। সুতরাং উভয়েরই রয়েছে উভয়ের প্রতি বিশেষ দায়িত্ব ও করণীয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে বলেন, “তারা তোমাদের আবরণ এবং তোমরা তাদের আবরণ”। (সুরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। দাম্পত্য জীবন সুখী ও স্থায়ী হতে যে সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে স্বামী ও স্ত্রীর উপর সে সকল দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রায় সবগুলোই সংক্ষেপ আকারে বর্ণিত হয়েছে কুরআনের এ আয়াতে; ‘ যেমন নারীদের উপর তোমাদের অধিকার রয়েছে, তেমন তাদের জন্যও অধিকার রয়েছে ন্যায্য-যুক্তিসংগত ও নীতি অনুসারে। তবে নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৭)। আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেকের উপর প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে। যদিও আনুগত্য এবং রক্ষনা- বেক্ষন ও অভিভাবকত্বের বিবেচনায় শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের। এখানে আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে বিরাজমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য কুরআন সুন্নাহ এর আলোকে উল্লেখ করছি।

প্রথমত ঃ যে সকল দায়িত্বের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সমান:
১. দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সততা, বিশ^স্ততা ও সদ্ভাব প্রদর্শন করা :                                                                                                                  যাদের মাঝে নিবিড় বন্ধুত্ব, অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক, অধিক মেলামেশা ও সবচেয়ে বেশী আদান-প্রদান তারাই স্বামী এবং স্ত্রী। এ সম্পর্কের চিরস্থায়ী রূপ দিতে হলে ভাল চরিত্র, পরস্পর সম্মান, ন¤্র-ভাব, হাসি- কৌতুক এবং অহরহ ঘটে যাওয়া ভুলকুচ ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা আবশ্যক। এবং এমন সব কাজ, কথা ও ব্যবহার পরিত্যাগ করা, যা উভয়ের সম্পর্কে চির ধরে, কিংবা মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন: ‘ তাদের সাথে তোমরা সদ্ভাবে আচরণ কর।’ (সুরা নিসা, আয়াত-১৮)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘তোমাদের মাঝে যে নিজের পরিবারের কাছে ভাল, সেই সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে ভাল।’ (ইবনে মাজাহ : ১৯৬৭)।

২. পরস্পর একে অপরকে উপভোগ করা:                                                                                                                                                       এর জন্য আনুষাঙ্গিক যাবতীয় প্রস্তুতি ও সকল উপকরণ গ্রহণ করা। যেমন সাজগোজ, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাসহ দুগন্ধ ও ময়লা কাপড় পরিহার ইত্যাদি। স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের এ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা। অধিকন্তু এগুলো সদ্ভাবে জীবন যাপনেরও অংশ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘ আমি যেমন আমার জন্য স্ত্রীর সাজগোজ পছন্দ করি, অনুরূপ তার জন্য আমার নিজের সাজগোজও পছন্দ করি। তবে পরস্পর এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উভয়কেই হারাম সম্পর্ক ও নিষিদ্ধ বস্তু হতে বিরত থাকতে হবে।

৩. বৈবাহিক সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষা করা :                                                                                                                                    সাংসারিক সমস্যা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা না করাই শ্রেয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে উপভোগ্য বিষয়গুলো গোপন করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সর্ব-নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে নিজের স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং যার সাথে তার স্ত্রী মিলিত হয়, অতঃপর সে এর গোপনীয়তা প্রকাশ করে বেড়ায়।’ (মুসলিম : ২৫৯৭)।

৪. পরস্পর শুভ কামনা করা, সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়া :                                                                        আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করা। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অপর থেকে উপদেশ পাওয়ার অধিক হকদার। দাম্পত্য জীবন রক্ষা করা উভয়েরই কর্তব্য। পরস্পর নিজ আতœীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করা। সন্তানদের লালন পালন ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে উভয়েই সমান, একে অপরের সহযোগী। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে পরস্পরকে সহযোগিতা কর।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত-২)।
দ্বিতীয়ত ঃ স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য:                                                                 ১) স্বামীর আনুগত্য করা :                                                                                                    স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। তবে যে কোন ক্ষেত্রেই আনুগত্য নয়, বরং যেসব ক্ষেত্রে আনুগত্যের নি¤œ বর্ণিত তিন শর্ত বিদ্যমান থাকবে।                                                                        ক) ভাল ও সৎ কাজ এবং আল্লাহর বিধান বিরোধী নয়, এমন সকল বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর জন্য কর্তব্য। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য বৈধ নয়।                                                                 খ) স্ত্রীর সাধ্য ও সামর্থের উপযোগী বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তার সাধ্যের বাহিরে অতিরিক্ত দায়িত্বারোপ করেন না।                                                                                                    গ) যে নির্দেশ বা চাহিদা পূরণে কোন ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, সে ব্যাপারে স্বামীর আনুগত্য করা।
২) স্বামীর আমানত রক্ষা করা :                                                                                                                                                                           স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজকে যাবতীয় অশ্লীলতা ও অপকর্ম থেকে হিফাজত করা এবং স্বামীর অর্থ সম্পদের আমানত রক্ষা করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘সাধ্বী স্ত্রীরা হয় অনুগতা এবং আল্লাহ তায়ালা যা হিফাজত যুগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে তা হিফাজত করে।’(সুরা নিসা, আয়াত-৩৪)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তিনটি জিনিস সৌভাগ্যের নিদর্শন। ১. ঐ স্ত্রী যাকে দেখলে তুমি বিমুগ্ধ বিমোহিত হও এবং তার কাছ থেকে দুরে থাকলে তার সতীত্ব ও তোমার সম্পদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাক। ২. দ্রæত পথ চলার ঐ বাহন, যে তোমাকে তোমার সফর সঙ্গীদের নাগাল পাইয়ে দেয়। ৩. প্রশস্ত ও আরাম দায়ক বাড়ী। (আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব)।

৩) স্বামীকে হাসি মুখে অভ্যর্থণা জানানো :                                                                                                                                                           স্বামী যখনই বাহির থেকে ঘরে ফিরে আসেন, তখন স্ত্রীর কর্তব্য হচ্ছে হাসিমুখে তাকে অভ্যর্থণা করা, স্বাগতম জানানো। স্বামী যত ক্লান্ত শ্রান্ত হয়েই ফিরে আসুক না কেন এবং তার হৃদয় যত বড় দুঃখ, কষ্ট ও ব্যর্থতায়ই ভারাক্রান্ত হোক না কেন, স্ত্রীর মুখে অকৃত্রিম ভালোবাসাপূর্ণ হাসি দেখতে পেলে তিনি তার সব কিছুই নিমিষে ভুলে যেতে পারেন। কাজেই যে সকল স্ত্রী স্বামীর সামনে মুখ গোমড়া করে থাকে, উদার হৃদয়ে স্বামীর সাথে প্রাণ খোলে কথা বলে না, তারা নিজেরাই নিজেদের ঘর ও পরিবারকে নিজেদেরই একমাত্র আশ্রয় দাম্পত্য জীবনকে ইচ্ছে করেই জাহান্নামে পরিণত করে।

৪) স্বামীর দৈহিক চাহিদা পূরণ : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: স্বামী যখন স্ত্রীকে শয্যা গ্রহণের আহŸান করে তখন সে যদি তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করে তাহলে সকাল হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তার প্রতি লা’নত করতে থাকেন। (সহীহ আল বুখারী, হা. নং-৫১৯৩)। তিনি আরো বলেন, স্বামী যখন যৌন প্রয়োজনে স্ত্রীকে ডাকবে, তখন সে চুলায় রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকলেও সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর ডাকে সাড়া দিবে। (জামে আত্ তিরমিযি, হা. নং ১১৬১)।

৫) স্বামীর জন্য সেজেগুজে চলা : সাজানো কক্ষ, ফুল, প্রাকৃতিক ছবি, সুন্দর চেহারা এবং মনোরম বিছানা দ্বারা পরিপাটি কক্ষে বসলে ¯œায়ূ ¯িœগ্ধ হয়ে আসে এবং মানসিক প্রশান্তি বেড়ে যায়। তেমনি স্বামীও যদি সুসজ্জিত স্ত্রীকে দেখে যে সে তার উদ্দেশ্যে সুগন্ধি ব্যবহার করে, ঘর-বাড়ী পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখে, সকল বিষয় সুষ্ঠভাবে সংগঠিত করে, মুচকী হাসি সহকারে তাকে স্বাগত জানায়, তার সাথে আলাপ করে, আবেগ-উচ্ছাসের স¦াদ উপলব্ধি করে, তার আবেগ, সোহাগ ও আদর যতেœর কারণে নিজের দুঃখ কষ্ট ভুলে যায়, তার আরামের সময় উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয় এবং অভ্যস অনুযায়ী স্বামীর প্রবেশ ও প্রস্থানের সময়কার সকল প্রয়োজন পূরণ করে, সে স্ত্রীকে দেখলেও স্বামী আনন্দিত না হয়ে পারে না। মূলতঃ সেই স্ত্রী তার কাছে পৃথিবীর সর্বউত্তম সম্পদ ও হুর, জীবনের আনন্দ খুশি এবং ঘরের আলো ও সৌন্দর্য। তার হাতে রয়েছে সৌভাগ্যের চাবিকাঠি ও জীবনের সম্পদ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতইনা যথার্থ বলেছেন, ‘দুনিয় হচ্ছে, উপভোগ্য সম্পদ। আর দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগ্য সম্পদ হচ্ছে, নেককার স্ত্রী।’ (সহীহ মুসলিম)। অন্য এক হাদীসে নেককার স্ত্রীর ব্যাখ্যা এসেছে যে, ‘তুমি তার দিকে তাকালে আনন্দ পাও, তাকে কোন শপথ করালে সে তা পূরণ করে এবং তুমি তার থেকে  দূরে গেলে সে নিজের ও তোমার সম্পদের হিফাজত করে।’ গুনবতী স্ত্রী যদি সুসজ্জিত হয়, তাহলে তার দিকে তাকালে অধিক আনন্দ পাওয়া যাবে।

৬) স্ত্রীর তুলনায় স্বামীর মর্যাদা অনেক, এটা ভালভাবে জানা : আল্লাহ তা’য়ালা নারীদের ওপর পুরুষদের নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষনা করেছেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর ইরশাদ হল, ‘কোন স্ত্রী যদি এমতাবস্থায় মারা যায় যে, তার স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ ( ইবনু মাজাহ, তিরমিযি)। তিনি আরো ইরশাদ করেন, ‘আমি যদি কাউকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদাহ করার অনুমতি দিতাম তাহলে, স্বামীকে সিজদাহ করার জন্য স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম।’ (তিরমিযি)। আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত , আমি রাসুল (সাঃ) কে প্রশ্ন করলাম : নারীর ওপর সর্বাধিক অধিকার কার? তিনি উত্তরে বলেন, তার স্বামীর। তারপর আমি জিজ্ঞেস করি, পুরুষের ওপর সর্বাধিক অধিকার কার? তিনি উত্তর দেন যে, তার মায়ের। (বাজ্জার)। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন, ‘ আল্লাহ ঐ স্ত্রীর দিকে তাকাবেন না, যে নিজ স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, অথচ সে তার ওপর নির্ভরশীল। (নাসাঈ)।
তৃতীয়ত ঃ স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য:                                                                                                                                                                         ১) স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার করা : মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করবে।’ (সুরা আন নিসা, আয়াত-১৯)। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম।’ (জামে’ আত তিরমিযি, হা.নং-১১৬২)। তিনি আরো বলেন, তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে (পুরুষের) পাজরের হাড় থেকে। আর সবচেয়ে বাকা হচ্ছে পাজরের উপরের হাড়। যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে। আর যদি যে ভাবে আছে সে ভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। (সহী আল বুখারী, হা. নং- ৫১৮৬)।

২) দেনমোহর প্রদান : স্ত্রীর প্রতি স্বামী প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে সন্তুষ্টচিত্তে মোহর পরিশোধ করে দেয়। আল্লাহ এটি স্বামীর উপর ফরজ করেছেন। স্ত্রীকে দেনমোহর দানের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আর তোমরা স্ত্রীদেরকে খুশি মনে তাদের মোহর দিয়ে দাও।(সুরা নিসা, আয়াত-৪)। মোহর হচ্ছে, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সম্মান প্রদর্শন ও তার সাথে জীবন যাপনের আগ্রহ প্রকাশ।

৩) স্ত্রীর ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করা : স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করা ফরজ। স্ত্রীর যাবতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব স্বামীর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। এজন্য যে আল্লাহ একের ওপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এজন্য যে তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। (সূরা নিসা, আয়াত-৩৪)। তিনি আরো বলেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী (স্ত্রীর জন্য) খরচ করবে।’ (সূরা তালাক, আয়াত-৭)। সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তি গোনাহগার হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যাদেরকে পালন করে তাদেরকে খোরপোষ দেয় না। স্ত্রী খোরপোষ পাওয়ার অন্যতম হকদার, চাই সে যতই ধনী হোক না কেন।

৪) নিরাপধ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা : স্ত্রীর মৌলিক অধিকারের আরেকটি হলো নিরাপদ বাসস্থান বা নিরাপধ আবাসন। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীকে থাকার জন্য এমন একটি ঘর বা কক্ষ দিবেন, যে কক্ষে স্বামী ব্যতিত স্ত্রীর অনুমতি অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবেনা। এমনকি স্বামীর পিতা-মাতা, ভাই-বোনও না। স্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে ঐ ঘরে বা কক্ষে তিনি তালা-চাবিও ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে কুরআনের নির্দেশনা হল, তোমরা তাদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী এমন বাসস্থানে রাখ, যেখানে তোমরা নিজেরা থাক। (সুরা তালাক, আয়াত-৬)

৫) স্বামী স্ত্রীকে দ্বীনের প্রয়োজনিয় বিষয়াদি শিক্ষা দিবে : স্বামীকে স্ত্রীর বিষয়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কেননা তিনি স্ত্রীর উপর দায়িত্বশীল। তাই স্বামীর উপর আবশ্যকীয় দায়িত্ব হচ্ছে, তিনি তার স্ত্রীকে দ্বীনের যাবতীয় বিষয়ে জ্ঞান দান করবেন। স্বামী না পারলে আলেমদের কাছ হতে জিজ্ঞাসা করে নিবেন। তাও যদি সম্ভব না হয় তা হলে স্ত্রীকে বাহিরে যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে। এমনকি ফরজ ওয়াজিব শিক্ষা লাভে স্বামীর অনুমতি ব্যতিতও স্ত্রী বাহিরে যেতে পারবে।

৬) ভারসাম্যপূর্ণ আতœমর্যাদাবোধ : স্বামী হচ্ছে স্ত্রীর পূর্ণ দায়িত্বশীল। আল্লাহ ও সমাজের লোকের কাছে তাকে সে দায়িত্বের বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। স্বামী যদি স্ত্রীকে শরীয়াত এবং সামাজিক রীতি নীতির বিরুদ্ধে যা ইচ্ছে তাই করতে দেয়, তাহলে সে লোকের চোকে হেয় ও ঘৃণিত সাব্যস্থ হবে। যার মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ নেই সমাজে ও দ্বীনের দৃষ্টিতে সে মর্যাদাবান ব্যক্তি বলে বিবেচিত হয় না। স্বামী আত্মমর্যাদাবোধের কারণে তার স্ত্রীর সতর ও সৌন্দর্যের প্রতি অন্যের নজরকে সহ্য করতে পারে না। অনুরূপ ভাবে স্ত্রীও চায় না যে, তার স্বীর সাথে অন্য কোন মেয়ে লোক স্ত্রীসুলভ আচরণ করুক।

৭) একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে ইনসাফপূর্ণ পালা বন্টন : যদি কারো একাধিক স্ত্রী থাকে তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করা স্বামীর অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একটি দিন ও একটি রাত নির্ধারণ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যার দু’জন স্ত্রী আছে আর সে তার মধ্যে একজনের প্রতি অধিক ঝুকে পড়ে, সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন অর্ধাঙ্গ অবশ অবস্থায় উত্থিত হবে।’ (আবু দাউদ হা.নং-২১৩৩)

৮) স্ত্রীকে নিজ আতœীয় স্বজনের বাড়ীতে বেড়ানোর সুযোগ দেওয়া : বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর বাড়ীতে আসার কারণে স্ত্রী তার আত্মীয় স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজন তাকে লালন পালন করেছে, তাদেরকে দেখার আগ্রহ মানবিক স্বভাবজাত। অধিকন্তু প্রয়োজনে, মা-বাবার সেবার সুযোগও তাকে দিতে হবে। অন্যথায়, আত্মীয়ের অধিকার ক্ষুণœ করার কারণে স্ত্রী গুণাহগার হবে। ইসলাম স্ত্রীর এই অধিকার স্বীকার করে।

৯) স্ত্রীকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা : এটাও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অংশ বিশেষ। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘আপনি আপনার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোন রিয্ক চাই না বরং আমিই আপনাকে রিয্ক দিয়ে থাকি এবং মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম। (সুরা ত্বোহা, আয়াত-১৩২)। তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘হে মুমেনরা! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে সে দোজখ থেকে বাচাও, যার জ¦ালানী হচ্ছে মানুষ ও পাথর।’  (সুরা তাহরীম, আয়াত-৬)। তাই স্বামীদের দায়িত্ব হলো স্ত্রীদেরকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা।

১০) স্ত্রীকে কষ্ট না দেয়া : স্বামীর উচিত, স্ত্রীর প্রতি খারাপ আচরণের বেলায় খুব সতর্ক হওয়া। মানুষ কেন কোন, কোন পশু পাখিকেও কষ্ট দেয়া হারাম। যে ব্যক্তি কোন মানুষ কিংবা পশুকে কষ্ট দেয় আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবেন। তাহলে, যে স্বামী তার স্ত্রীকে কষ্ট দেয় তার বিষয়টি আরো কত মারাত্মক। কেননা, আল্লাহ তাকে নিজ কালিমা ও বাণী দ্বারা স্ত্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করার ক্ষমতা দিয়েছেন। স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি উল্লেখিত অধিকার পূরণ করে তাহলে, নারী জাতি পৃথিবিতে সর্বোত্তম সম্মান ও সুখ লাভ করতে সক্ষম। আর এই অধিকার গুলো পূরণ করা ইসলামের অন্যতম দাবী। ইসলামই কেবল নারী জাতির সর্বোত্তম শান্তি, নিরাপত্তা ও সুখের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম।


Categories