আমলাতন্ত্রের রোষানলে বেসরকারি শিক্ষকরা

প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০

বৃটিশ উপনেবেশিক শাসনামল থেকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের উদ্ভাবন। রাষ্ট্র পরিচালনায় কৌশল নির্মিত হয় রাজনীতিবিদদের হাতে, আর তা বাস্তবায়ন করে আমলারা। সাধারণত আমলা বলতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বোঝায়। পাকিস্তান আমলে সিএসপি ও ইপিসিএস বর্তমানে বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা আমলা শ্রেণিভুক্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এসব কর্মকর্তারাই রাষ্ট্রের ভালোমন্দ দেখা শুনা করেন। রাজনীতিবিদরা নীতির বাস্তবায়নে আমলাদের ওপরই নির্ভরশীল থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রভুত্ববাদী মানসিকতায় আমলারা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলেই জনগণের দুঃখকষ্ট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।

জাতির দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর থেকে দেশের আমলাতন্ত্র অতিমাত্রায় প্রভুত্ববাদী চেতনায় বিকশিত হতে শুরু করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলাদের উদ্দেশ্যে দেয়া সে-ই বক্তব্যের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।  অবৈধ উপায়ে বিত্তশালী হওয়ার লিপ্সা, সিনিয়রদের পিছনে ফেলে জুনিয়রদের পদপদবি দখলের ফলে আমলাদের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। অপরদিকে বিধি বহির্ভূতভাবে সুবিধাভোগী আমলারা পদপদবি বা অতিরিক্ত সুবিধা লাভের আশায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সার্বক্ষনিক ব‍্যাস্ত থাকেন। এতে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করে, সঠিক কাজটি সঠিক সময়ে করা সম্ভব হয়ে উঠেনা।

২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের দায়িত্বভার গ্রহণের পর বিপর্যস্ত শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষানীতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই তিনি জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। কমিটি প্রায় এক বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে জাতীয় শিক্ষানীতি’২০১০ মহান সংসদে অনুমোদিত হয়।
দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭.৫৪% শিক্ষার দায়িত্ব পালন করেন বেসরকারি ব‍্যবস্থাপনায়। সরকারি বেসরকারি পাঠ‍্যপুস্তক, কর্মঘন্টা, পাঠ‍্যক্রম, সিলেবাস, পরিক্ষা পদ্ধতি এক ও অভিন্ন। এতদসত্ত্বেও সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন-ভাতা ও মর্যাদার বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। আমলাদের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অনিহা ও রোষানলে পড়ে বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

নিম্নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শিক্ষকদের বঞ্চনা ও বৈষম্য সৃষ্টির খন্ডচিত্র তুলে ধরা হলো।

এক।
জাতীয় শিক্ষানীতি’ ২০১০ এর ২৫ অধ‍্যয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় সতন্ত্র বেতন স্কেল দেওয়া হবে। আমলাদের প্রবল বিরোধিতার কারণে দীর্ঘ দশ বছরেও সতন্ত্র স্কেল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। আমলাদের ভয় শিক্ষকদেরকে সতন্ত্র স্কেল দেওয়া হলে ক‍্যাডার ও শিক্ষকদের মধ্যে পদ মর্যাদার ভারসাম্য রক্ষায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

দুই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিও নীতিমালা এবং জনবল কাঠামো’২০১৮ প্রকাশ করেছে। এই নীতিমালা মূলত নৈতিকতা বিবর্জিত স্বার্থান্বেষী আমলাদের তৈরিকৃত  শিক্ষকদেরকে বঞ্চিত ও বৈষম্য সৃষ্টির অভিপ্রায়ে একটি বিতর্কিত নীতিমালা। এতে শিক্ষকদের টাইমস্কেল পূর্বের ৮ বছরের স্থলে ১০ বছর ও ১২ বছরের অভিজ্ঞতার স্থলে ১৬ বছর করা হয়েছে। প্রভাষকদের ১০ বছর পর একটি টাইমস্কেল প্রাপ্ত হবেন যা মাত্র এক হাজার টাকার ব্যবধান। বিতর্কিত অনুপাত প্রথায় সহকারী অধ্যাপকের ৫:২ বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রভাষকরা আজীবন প্রভাষক হিসেবেই অবসরে যেতে বাধ্য হবেন। অনুপাত প্রথার কারণে একই শিক্ষাগত যোগ্যতায় একজন সহকারী অধ্যাপক অন্যজন আজীবন প্রভাষক এটি মেনে নেয়া সত্যি কঠিন। অনুপাত প্রথার বিলুপ্তি ও ৮ বছর পূর্তিতে প্রভাষকদের ৭ম গ্রেডে পদোন্নতি দেয়া প্রয়োজন।

তিন।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে আমলাদের সুনির্দিষ্ট কোনো ভাবনা চিন্তা আছে বলেও প্রতীয়মান হয় না। অথচ দেশের সবচেয়ে মেধাবী এই শ্রেণীটির উপর দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার দায়ভার ন্যস্থ ছিলো। কিন্তু আমলাদের প্রভুত্ববাদী মানসিকতার কারণে শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে আশানুরূপ অবদান রাখতে পারেনি কখনোই। দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে মূলত আমলারা বিরোধী পক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন দৃশ্যমান হচ্ছে।

চার।
সরকারের প্রবল সদিচ্ছা থাকার পরও আমলাদের রোষানলে পড়ে বিগত ১০ বছরে জাতীয় শিক্ষানীতির ৩০% সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সরকারের বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও একটি শিক্ষা আইন তৈরি করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বরঞ্চ আওয়ামী সরকারের ১১ বছরের শাসনামলে আমলাদের রোষানলে ও চাতুরিপনায় শিক্ষায় বৈষম্য সৃষ্টি শিক্ষকদের মধ্যে ব্যপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়মের দায়ে জড়িত থাকায় জেল হাজতে প্রেরণ করার নজির স্থাপন করা হয়েছে।

পাঁচ।
২০১৫ সালে জাতীয় পে-কমিশন গঠনের পর বাংলাদেশে আর কোন পে-কমিশন গঠন করা হবে না। বাজার মূল্যস্ফীতির উপর ভিত্তি করে বার্ষিক সর্বনিম্ন ৫% প্রবৃদ্ধি প্রদান করা হবে। আমলাদের কারসাজিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের দুই বছর পর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেয়া হয়েছে। এতেও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানোন্নয়নে।

ছয়।
২০১৮-২০১৯ প্রাক-বাজেট আলোচনায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা বাজেট প্রনয়নে আমাকে যথাযথ সহযোগিতা করছে না। এ থেকেও প্রতিয়মান হয় যে, আমলারা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের জীবন মান উন্নয়নে মোটেও আগ্রহী নন।

সাত।
বেসরকারি শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধিতে কৌশলে প্রহসনের ৫ গুন ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রণালয়ে। পূর্বে বাড়িভাড়া ছিল ২০০ টাকা তা ১ হাজার টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ১ শত টাকা তা ৫’শ টাকা করা হয় । শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই হলো আমলাদের জগণ্যতম তামাশা আর প্রহসনের  বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির নমুনা।

আট।
বেসরকারি শিক্ষকদের  উৎসবভাতা ২৫% যা অত্যন্ত অমর্যাদাকর এবং সামাজিক বাস্তবতায় অসামঞ্জস্য। দেশের পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও আমলারা অদ্য যাবত কার্যকর কোন উদ্যোগ বাঁ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

নয়।
দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরেও অবসর-কল্যাণ ট্রাষ্টে অতিরিক্ত ৪% কর্তনের প্রজ্ঞাপন জারি ও বেতন কর্তন করে আমলারা প্রমাণ করেছে বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি তারা কতোটা ক্ষুব্ধ।

দশ
২০১৫ পূর্ববর্তী সময়ে বেসরকারি শিক্ষকরা একটি টাইম স্কেল পেয়ে আসছিল, অথচ কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘ পাঁচ বছর সেই টাইমস্কেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭% দায়িত্বে নিয়োজিত বেসরকারি শিক্ষকদের বঞ্চনা, বৈষম্য ও অভুক্ত উদরে রেখে মানসম্মত শিক্ষার ধারণা অমূলক। শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা এবং যথাযথ সম্মান মর্যাদা ও আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বভার রাষ্ট্রকেই পালন করতে হবে। গুণগত মানের শিক্ষা ব্যতীত এবং শিক্ষা হীন মানুষের আবির্ভাবে সমাজের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। দেশের আমলারা মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষিত, তাদের দ্বারা জাতির কতটা কল্যাণ হয়েছে তার পরিসংখ্যানের প্রয়োজন। ভালো হোক, মন্দ হোক জাতীয় কল‍্যাণ যতটুকু অর্জিত হয়েছে, তার সবটুকু রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারাই হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আমলাতান্ত্রিক নির্ভরশীলতা দূর করা উচিত। আমলাতন্ত্রের রোষানল থেকে শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরণ এবং মানোন্নয়নে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেই এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়রণের লক্ষ্যে সংসদে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক নেতাদেরকেই। সেই প্রত্যাশায়

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম