“অপরাধ না করেও অপরাধী হওয়া-রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের দোষ কী?

প্রকাশিত: ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২০

জুনাইদ আল হাবিব

গ্রামাঞ্চলের যেসব সংসারে টানাটানি, সেসব সংসারের অভাব গোছাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাড়ি দেয় মোটামুটি বয়সে কর্মক্ষম শ্রমিকরা। যে প্রবাসে যাবে, তার হাততো খালি। সে জন্য আত্মীয়-স্বজনরা মিলে, সাহায্য সহযোগিতা করে বাড়তি আয়ের জন্য মা-বাবা সন্তানকে পাঠিয়ে দেন প্রবাসে।

স্বজনদের সহযোগিতার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ, হাওলাত-বরাত করে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে জীবন বদলের স্বপ্ন বোনেন মা-বাবারা। মাঝে মাঝে দালালের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার ঘটনাও কম ঘটে না। তবুও স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে হয় প্রবাসজীবনে। কখনো মালিক ভালো হয় না, কখনো কর্মেমান্দ্য। এসব বিষয় প্রবাসীদের জীবনকে জটিল এবং কঠিন করে তোলে।

জীবনের গল্প বদলের চেষ্টায় প্রবাসে পা রাখা এসব প্রবাসী শুধু নিজের জন্যই কাজ করে যান না। বিদেশে একেক জন লড়েন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে। রেমিট্যান্স আয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি উঁকি দেয় মুক্ত অর্থনীতিতে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিশ্বের শীর্ষ দশ দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নামটিও।

২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবাসী আয়ে বিশ্বে বাংলাদেশ নবম। প্রথম অবস্থানে আছে ভারত, দ্বিতীয় অবস্থানে চীন, তৃতীয় মেক্সিকো, চতুর্থে ফিলিপাইন, পঞ্চম অবস্থানে মিসর, ষষ্ঠ নাইজেরিয়া, পাকিস্তান সপ্তমে, ভিয়েতনাম অষ্টমে, বাংলাদেশ নবম এবং ইউক্রেন দশম স্থানে রয়েছে।

গেল বছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন এক হাজার ৮৩৩ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ এক লাখ ৫৫ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। আর এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রা এসেছিল এক হাজার ৫৫৩ কোটি ডলার। সেই হিসাবে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ শতাংশ।

কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, প্রবাসীদের কারণে দেশের অর্থনীতি এত চাঙ্গা থাকলেও বিভিন্ন সময়ে প্রবাসীরা বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে অবহেলার শিকার হন। বেশিরভাগ প্রবাসী অভিযোগ করেন, এয়ারপোর্ট বা ভিসা সংক্রান্ত জটিলতায় তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। আবার বিভিন্নভাবে সক্রিয় থাকে দালালচক্র। তাদের কর্মকাণ্ডকে দমন করতে তেমন কার্যকরী পদক্ষেপও নেই।

মাঝে মাঝে প্রবাসে কিছু প্রবাসীর মানবেতর জীবনযাপনের গল্পের খোঁজ মেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা দালালের খপ্পরে পড়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন। শুরুর দিকে ভিসা বিক্রির সময় বলা হয়, দোকান বা অন্য কোনো আরামপ্রদ কাজ পাইয়ে দেবে। কিন্তু ভাগ্যে মেলে খেজুর গাছের কাজ। এতে এসব কাজ না জানা প্রবাসীরা কান্না করেন, মা-বাবাও চরম চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দূর দেশে ছেলের কান্না কেই বা সইতে পারে? এভাবে ভাগ্যবদলের স্বপ্নে বিদেশ গিয়ে পথে বসে অনেক পরিবার।

কাগজপত্রে বৈধভাবে প্রবাসে গেলেও অবৈধ হয়ে যায় অনেকে। এতে পতাকা জটিলতায় মালিক ও কাজ হারান অনেকে। মাঝে মাঝে অনেক প্রবাসীর পরিবার থেকে শোনা যায়, গোপনে প্রবাসীরা কাজ করেন। সংসার টিকিয়ে রাখতে কিংবা জীবন বাঁচানোর তাগিদে এছাড়া যে কোনো উপায় নেই তাদের। কিন্তু এটা কি কখনো পাওয়ার ছিল প্রবাসীদের? কেন এমন হয়? বিষয়গুলো কি খতিয়ে দেখা হচ্ছে?

তারপরে সম্প্রতি প্রবাসীদের নিয়ে যে ধরনের নিচুমনের আলোচনা-সমালোচনা চলছে, এসব কি আমরা ঠিক করছি? আদৌ কি আমরা এসব ভাবছি? অনেকেই বলেন, এদেশে প্রবাসীরা করোনা আমদানি করেছে। আচ্ছা, দেশে প্রবাসী না থাকলে কি কোনোভাবেই করোনাভাইরাস আসতো না? এ পর্যন্ত বিশ্বের যে সমস্ত রাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণ হয়েছে, সবগুলো রাষ্ট্রে কি ওই রাষ্ট্রের প্রবাসীরা ঢুকে সংক্রমণ ঘটিয়েছে? করোনা শুধু প্রবাসী ছড়ায়, এ জায়গা থেকে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের ধারণাটা ভুল। প্রবাসীরা করোনা সংক্রমণ না করলেও ট্যুরিস্ট বা যেকোনোভাবেও দেশে করোনার সংক্রমণ হতে পারতো।

অথচ দেখুন আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা নড়বড়ে। যে সময় দেশে প্রবাসীরা দেশে ঢুকছে, তাদের যে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে, সেখানের পরীক্ষার রিপোর্টগুলো ঠিক ছিল? যদি ঠিকই থাকতো, তবে কি দেশে এইভাবে করোনা ছড়াতো? ধরুন কোনো একজন প্রবাসীর করোনা রিপোর্ট পজিটিভ। কিন্তু তাকে ধরিয়ে দেয়া হলো নেগেটিভ। এইভাবে করোনা সংক্রমণ ছড়ানো হয়েছে পুরো দেশে। ভুয়া রিপোর্ট আর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে দেশের আজ এই দশা। তারপর কী ঘটনা হয়েছে? ওই গার্মেন্টস খুলে দেয়া হয়েছিল। তারপর সারাদেশে করোনা রফতানি হয়। এ দোষটা কি প্রবাসীদের?

আজ সাহেদ-সাবরিনারা ধরা পড়ে। নেট দুনিয়ায় তোলপাড় হয়। কিন্তু দেশের তো মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে। সেদিকে কি আমাদের খেয়াল আছে? সাহেদ-সাবরিনারা যে করোনার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে, তারপর ইতালিতে প্রবাসীরা গিয়ে ফিরে এসেছে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হয়েছে। চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠছে। যদি আমাদের দেশে এমন দুর্নীতি না হতো, তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসীদের ‘ভাইরাস-বোমা’ বলার সুযোগ পেত না। এখন দোষটা কি প্রবাসীদের, না যারা দুর্নীতি করেছে তাদের?

এরই মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ কাঁধে নিয়ে পার না পেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজি পদত্যাগ করলেন। কিন্তু আমাদের দেশটাকে যে তারা শেষ করে দিলেন, সেটার কি বিচার হবে? মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইতোমধ্যে শ্রমিক রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। করোনার আগে বা করোনার সময়ে এসে যারা দেশে এসে আটকা পড়েছেন, তারা কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেকই কর্ম হারানোর শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। প্রবাসীদের অনেকেই অভিযোগ করেন, এসব ভুয়া রিপোর্টের কারণে ফ্লাইট বন্ধ। আমরা কর্মস্থলে ফিরতে পারছি না।

করোনার আগে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় অনেক থাকলেও করোনার প্রভাবে রেমিট্যান্স আয় অনেক কমেছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে অপরাধ না করেও অপরাধী হওয়া রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের দোষ কী?

বিএ