অনুপাত প্রথা শিক্ষায় বৈষম্যকে প্রকট করেছে

প্রকাশিত: ৮:৩১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০২০

জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা- ২০১৮ এর কতিপয় ধারা শিক্ষকদের বিশেষ করে কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি কলেজের প্রভাষকদের চরম ভাবে হতাশ করেছে।

২০১৮ এর এমপিও নীতিমালার ১১.৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “ এমপিওভূক্ত প্রভাষকগণ প্রভাষক পদে এমপিওভূক্তির ৮(আট) বছর পূর্তিতে 5:২ অনুপাতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন। এতে মোট পদসংখ্যা বৃদ্ধি পাবেনা। অন্য প্রভাষকগণ এমপিওভূক্তির ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তিতে বেতন গ্রেড ৯ থেকে ৮ প্রাপ্য হবেন। ….”

এই অনুচ্ছেদটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৮ বছর পর একটি কলেজের ৭ জন প্রভাষকের মধ্য হতে ২ জনকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে  সহকারী অধ্যাপক পদে (৬ষ্ঠ গ্রেডে) পদোন্নতি দেওয়া হবে। অর্থাৎ ২৮ % সৌভাগ্যবান প্রভাষক শুধুমাত্র আগে যোগদান, এমপিওভূক্তি কিংবা বয়সে বড় হওয়ার কারণে সহকারী অধ্যাপক পদে (৬ষ্ঠ গ্রেড,) পদোন্নতি পাবেন। হতভাগা অবশিষ্ট ৭২% প্রভাষক ১০ বছর পর ৯ম গ্রেড(২২০০০) থেকে ৮ম গ্রেডে (২৩০০০) উন্নীত হবেন। প্রসঙ্গত, ৯ম গ্রেড থেকে ৮ম গ্রেডের ব্যাবধান মাত্র ১ হাজার টাকা। একই পদে একই যোগ্যতায় চাকুরি করে কারো ৮ বছর পরে পদোন্নতি সহ বেতন বাড়বে ১৩৫০০ টাকা আর অবশিষ্ট অধিকাংশের ক্ষেত্রে সারা জীবন পদোন্নতি তো পাবেনই না বরং ১০ বছর  বেতন বাড়বে মাত্র ১ হাজার টাকা! এ রকম কালো আইন বোধ হয় পৃথিবীর আর কোথাও নেই।  অথচ ১৯৯৫ এর নীতিমালা অনুযায়ী প্রভাষকরা ২ বছর পূর্তিতে ৮ম গ্রেড এবং ৮ বছর পূর্তিতে ৭ম প্রেড পেতেন।২০১০ এর এমপিও নীতিমালায় ২ বছর পর ৮ম গ্রেডের বিধান পরিবর্তন করলেও ৮ বছর পর ৭ম গ্রেড বহাল রাখা হয়।(এমপিও নীতিমালা ২০১০, অনুচ্ছেদ ১১,.৪)। সরকারি কলেজের প্রভাষকরা প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেলেও এমপিওভূক্ত কলেজের প্রভাষকরা সারাজীবনে মাত্র একটি পদোন্নতি পান (সহকারী অধ্যাপক পদে) । তাও আবার অনুপাত প্রথার কারণে ৭২% প্রভাষক আজীবন একই পদে থেকেই অবসরে যেতে হয়। দেখা যায় একজন বয়োবৃদ্ধ শিক্ষক অবসরের সময়েও প্রভাষক অথচ উনার ছাত্র সহকারী অধ্যাপক হয়ে গেছে। এ যে কত হৃদয় বিদারক তা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো পক্ষে উপলব্ধি করা বোধ হয় সম্ভব নয়। আগের নীতিমালাগুলোতে পদোন্নতি বঞ্চিত প্রভাষকরা ২ বছর পর ৮ম গ্রেড এবং ৮ বছর পর ৭ম গ্রেড পেয়ে কিছুটা সান্ত্বনা পেতেন। কিন্তু ২০১৮ এর নীতিমালায় ১০ বছর পর ৮ম গ্রেড তথা ১ হাজার টাকা বৃদ্ধি করার বিধান করায় প্রভাষকদের শেষ ভরসাটুকুও আর রইলনা। প্রসঙ্গত ২০১০ এর জনবল কাঠামোর ১১(৫) ধারায় সহযোগী অধ্যাপক পদের কথা উল্লেখ থাকলেও ২০১৮ এর নীতিমালায় তা বাদ দেওয়া হয়েছে।

২০১০ এর নীতিমালায় প্রভাষকরা ১২ বছরের অভিজ্ঞতায় উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ কিংবা ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে এবং ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু ২০১৮ এর নীতিমালায় অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে ১২/১৫ বছরের অভিজ্ঞতার সাথে সহকারী অধ্যাপক পদে ৩ বছরের অভিজ্ঞতার বিধান করা হয়েছে। ফলে কপাল দোষে যারা সহকারী অধ্যাপক হতে পারলেননা, তাদের ভাগ্যে আর কিছুই রইলনা।

গত বছরের ১২ নভেম্বর এমপিও নীতিমালা সংশোধনের লক্ষ্যে ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে ১ মাসের ভিতরে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পেশ করার জন্য বলা হয়েছিল। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে নীতিমালা সংশোধন কমিটির কয়েকটি বৈঠকে উপর্যুক্ত সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হলে প্রভাষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। তবে বেশকিছু দিন ধরে উক্ত কমিটির কোন তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। কিন্তু সম্প্রতি এমপিও নীতিমালা – ২০১৮ এ কোন পরিবর্তন না এনে উচ্চতর স্কেলের আবেদন চালু করায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি কলেজের প্রভাষকরা।১০ বছর চাকুরির পর ১ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।

দেশের শিক্ষাব্যাবস্থার প্রায় ৯৭% দায়িত্ব পালন করেন বেসরকারি এমপিওভূক্ত শিক্ষকগণ। শিক্ষার মূল কারিগর হলেন শিক্ষক সমাজ। অথচ তাদের বেতন ভাতা খুবই নগণ্য। তাদের যে সামান্য সুযোগ সুবিধা ছিল তাও যদি কেড়ে নেওয়া হয় তাহলে শিক্ষকদের মনে ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম নিবে। ফলে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ বিঘ্নিত হবে।তাছাড়া এভাবে শিক্ষকদের  সুযোগ সুবিধা কমতে থাকলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশার প্রতি নিরুৎসাহিত হবে।

মো. জহিরুল ইসলাম ফকির

প্রধান সমন্বয়কারী

পদোন্নতি বঞ্চিত প্রভাষক সমাজ ও

প্রভাষক, সরদার আছমত আলী মহিলা ডিগ্রি কলেজ

মনোহরদী, নরসিংদী ।

 

 


Categories