“অনলাইন/ভার্চুয়াল শিক্ষা : দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য চাই বিশেষ সুবিধা”

প্রকাশিত: ৮:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০

উন্নত বিশ্ব তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সবসময় প্রস্তুত থাকে। এটা শুধু করোনাকালীন বলে নয়- আমি জাপানে শিক্ষাগ্রহণের সময়ে ই-মেইলে ক্লাশ রিপোর্ট জমা দিতাম। সেটা ১৯৯৭-৯৮ সালের কথা, আজ থেকে ২৩ বছর আগে। ওদের শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চের খোলের মধ্যেই যতজন শিক্ষার্থী ততটা কম্পিউটারের মনিটর আঁটানো থাকতো। সেগুলোতে ইন্টারনেট যুক্ত করা ছিল। তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগীয় অফিসে কোন কম্পিউটার কেনা হয়নি। আমরা বিদেশে স্কলারশিপ পাবার দক্ষতা অর্জনের জন্য ছুটির দিনে কাঁটাবন মার্কেটে গিয়ে কম্পিউটার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিয়েছি ব্যক্তিগতভাবে। দিন কত দ্রুত বদলায় তা বলাই বাহুল্য।

যে কোন পরিবর্তিত পরিস্থিতির সংগে খাপ খাইয়ে নেয়াটা হলো বুদ্ধিমানের কাজ। করোনা পুরস্থিতি শুরু হবার সাথে সাথে উন্নত বিশ্ব তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। সেজন্য তাদেরকে মুখ ফিরিয়ে অযথা কালক্ষেপণ করতে হয়নি। করোনার প্রাদুর্ভাবে অনেক দেশে স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যলয় সাময়িক বন্ধ ঘোষিত হলেও অনলাইন শিক্ষাক্রম এক সপ্তাহের মধ্যে চালু করা হয়েছে। এটা সম্ভব হবার মূল কারণ হলো তাদের ভার্চুয়াল শিক্ষার অবকাঠামো পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। বহু বছর আগে থেকে আমরা দূর শিক্ষণ নিয়ে ভাবলেও কখনো সর্বজনীন অনলাইন শিক্ষাক্রম চালাতে হবে এমন বিষয় কল্পনাও করিনি। করোনা পরিস্থিতি শুরু হবার পর অনেকে ভেবেছেন- এই তো ক’টা দিন। করোনা গেলেই ক্লাশে ফিরে যাব। কী দরকার অনলাইন শিক্ষা নিয়ে। এরশাদের আমলে তো ১-২ বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমনিতেই বন্ধ ছিল। হরতালের সময় ৩-৪ মাস অঘোষিত ছুটি ভোগ করতে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। তেমন কোন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু দেখতে দেখতে চার মাস গত হয়ে গেল। আমরা বোকার মত চেয়ে চেয়ে সময়টা পার করে দিলাম। এখন বলা হচ্ছে, করোনা সহসাই চলে যাবে না। আমাদেরকে এর সাথে ঘর-বসতি করে মানিয়ে চলতে হবে।

বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভাড, কেমব্রিজ, এমআইটি কেউ আমাদের মতো হাত গুটিয়ে এতদিন বসে থাকেনি। এমনকি আমাদের দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি কলেজ, দামী স্কুলগুলোও প্রায় সাথে সাথে তাদের অনলাইন শিক্ষাক্রম চালু করে দিয়েছে। তারা কেউ কেউ এখন পরীক্ষা নিচ্ছে। এর ফলে সেশনজট বলে হয়তো তাদের কোন বাধা থাকবে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী করব আর কী করবো না সেটা চিন্তা করতেই বেলা শেষ করে দিচ্ছি। এ বিষয়ে কোন সঠিক পরিকল্পনা যেন কর্মনীতিতে ফুটতেই চাচ্ছে না।

অনেকে অভিমত দিয়েছেন- প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, দামী স্কুলগুলো ছাত্রদের টাকায় চলে। তারা সরকারি বেতন পায় না। টাকা উপার্জনের জন্য প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে চলে গেছে। বেতন বন্ধ হবে তাই তারা তাড়াহুড়ো করে অনলাইন শিক্ষাক্রম চালু করে না দিলে উপায় নেই। আমরা তো সরকারি বেতন পাই, কেন এত ব্যস্ততা? যারা এমন হীন ধারণা পোষণ করছেন তাদের এই বদ্ধমূল ধারণা আদতে সত্য নয়। জনসেবার মানসে প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানত এত বেশি আছে যে তারা লভ্যাংশ দিয়ে কয়েক বছর ছাত্র-ফি ছাড়াই প্রতিষ্ঠানকে চালিয়ে নেবার ক্ষমতা রাখেন। ব্যবসায়িক মানসে শুরু করা কিছু প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যায়ের আর্থিক বিষয় সরকার দেখভাল করেন। তবে সরকারি বেতন পেলে অলসতা করে হাত গুটিয়ে বসে কাজ না করে সময় ক্ষেপণ করতে হবে এমন উদ্ভট চিন্তা তাদের মাথায় আসে কী করে সেটাই এখন বড় ভাবনার বিষয়।

শিক্ষার্থীদেরকে দ্রুত পাস করিয়ে দিলে বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াবে এমন ধারণা করে অনলাইন শিক্ষা চালু করতে বাধা দেয়াটা নিছক অন্যায়। কারণ, অনলাইনই একজন গ্রাজুয়েটকে গোটা বিশ্বটাকে চোখ মেলে তাকিয়ে দেয়ার অবারিত জানালা খুলে দিতে পারে। দ্রুত পাস করে নিজের ভাগ্যের উন্নতি সে নিজেই করে নিতে পারে। আজকাল ঘরে বসেই অনলাইনে নানা চাকুরি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এজন্য অনলইনেই শত শত দেশী-বিদেশী বিজ্ঞাপন দেখতে পাওয়া যায়। যোগ্যতা অনুযায়ী মনের মত পেশা ও কাজ খুঁজে নেবার আধুনিক প্লাটফর্ম হচ্ছে অনলাইন। সুতরাং অনলাইনে শিক্ষার মাধ্যমে দ্রুত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে একজন শিক্ষাবিদের জন্য এই অদূরদর্শী ধারণা করাটা অমূলক।

আজকাল অনলাইন টিভি, ডিশটিভি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানা উৎস ব্যবহার করে মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প, অর্থনীতি, সমরনীতি, পর্যটন, আন্তর্জাতিকতা ইত্যাদি নানা বিষয় সম্পর্কে তাবৎ দুনিয়ার নিত্যনতুন জ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় ঘটছে। অনলাইন শিক্ষা, অনক্যাম্পাস ক্লাশের বিকল্প নয় বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাচ্ছেন। উড়োজাহাজ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ পানিজাহাজে চড়ে হজ্জ করতে মক্কা যেতেন। তিনমাস ধরে বিভিন্ন বন্দরে বন্দরে ঘুরে সমুদ্র সাইক্লোন, প্লেগ, কলেরা ইত্যাদি মোকাবেলা করে অনেকে মক্কা পৌঁছুতে পারতেন না। কেউ কেউ বোম্বে গিয়েই ফেরত আসতেন। তাই আমরা এখনও বোম্বাই হাজির নাম শুনে থাকি। বর্তমানে বিমানের সেবা নিয়ে ৪-৫ ঘন্টায় মক্কা চলে যাওয়া যায। আধুনিকমনা কেউ কি এই যুগে পানিজাহাজে চড়ে মক্কা যাবার কথা কল্পনা করেন? এ যুগে সেই ধারণা করাটাই বোকামি। অর্থাৎ, যুগের দাবি ও সময়ের অনুভূত প্রয়োজন-এই দু’টো বিষয়কে নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বর্তমান করোনাকালীন কঠিন সময়ে ঘরবন্দী জীবনের একঘেঁয়েমী দুরবস্থাকে এড়িয়ে মানুষ বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা সচল রেখে এই কঠিন সময়ের অনুভূত প্রয়োজন হলো তাদেরকে পড়াশুনায় ব্যস্ত রাখা। ঘরের বাইরে না গিয়ে তাদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি তুলে দিয়ে যদি জ্ঞানচর্চাকে চালু রাখা যায় সেটাই হবে আমাদের সবার জন্য পরম পাওয়া।

আমরা অনলাইন শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া শুরু করি। তবে শুরুতেই এর একটা মজবুত কাঠামো তৈরি নিয়ে ভাবতে হবে। সেই কাঠামোর মধ্যে বর্তমান ও ভবিষ্যতের শিক্ষাসংক্রান্ত যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মত রূপরেখা থাকতে হবে। সন্দেহ নেই, করোনা পরিস্থিতি আগামী দু’এক মাসের মধ্যে ভাল হয়ে গেলে যেন আমরা আবার স্বাভাবিক ক্লাশরুমে ফিরে যেতে পারি সেরকম কিছু ঘটলেও যেন আমাদের ভার্চুয়াল শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে না যায়। সে অবস্থায় অনলাইন শিক্ষাক্রমের প্রক্রিয়া অনক্যম্পাস শিক্ষার সাথে সমানতালে পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারবে। অর্থাৎ, প্রতিটি বিভাগ তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো মেটানোর জন্য অর্ধেক শ্রেণিকক্ষে, অর্ধেক ভার্চুয়াল নিয়মে সম্পন্ন করতে পারবে।

এর উপকারিতার দিকটি উপেক্ষা করার মত নয়। যেমন, আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি নিয়ে প্রতিবছর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রয়োজনের তুলনায় সিটসংখ্যা কম। যারা ভর্তির সুযোগ পায় তাদের শ্রেণিকক্ষ সমস্যা। সেক্ষেত্রে আমরা একটি ব্যাচকে অনক্যাম্পাস শিক্ষার্থী, অপর দু’একটি ব্যাচকে ভার্চুয়াল ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি করাতে পারি। এজন্য কিছু অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিলেই বর্তমান অবকাঠামোর মধ্যেই ২-৩টি ব্যাচে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা যেতে পারে। আগামী সেশন থেকে অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা করে ডাবল শিফটে নতুন ভর্তি কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। ভার্চুয়াল ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা শ্রেণিকক্ষ লাগবে না, যাতায়তের জন্য অতিরিক্ত যানবাহন, বাস লাগবে না। হোস্টেল তৈরি করতে হবে না, চিকিৎসার জন্য খরচ লাগবে না। এ ছাড়া ভার্চুয়াল ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য কোন সেশনজট তৈরি হবে না-যদি শিক্ষকগণ তৎপর থাকেন খুব দ্রুত তাদের পরীক্ষা নেয়া ও ফলপ্রকাশ সম্ভব হবে। মহামারিবিহীন সময়ে শুধু অন-ক্যাম্পাস ব্যাচের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এদের ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। কারো ফিল্ডওয়ার্ক করতে হলে সেটার নির্দেশনা অনলাইনের মাধ্যমে প্রদান করলে শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে সেভাবে প্রস্তুত করে নিতে পারবে। সাপ্তাহিক ছুটির কোন দিনে এদের জন্য নবীনবরণ ও বিশেষ কনভোকেশন করা যেতে পারে।

মহামারি অথবা যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনলাইন শিক্ষাই সঠিক বিকল্প পন্থা হতে পারে। এরপর সময় ও পরিস্থিতি অনুকূল হলে তখনও এটার সুবিধাগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইন সংযোগের ফি মওকুফ এবং বিভিন্ন শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করার জন্য প্রস্তাব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগুলো ইউজিসির সাথে আলোচনায় অনেকটা এগিয়ে গেছে। সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এ জন্য অচিরেই একটি ইতিবাচক সমাধান আশা করা যাচ্ছে।

সময় কাউকে ক্ষমা করে না। সময়ের দাবি হচ্ছে সবচে সঠিক দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবহেলা করে কালক্ষেপণ না করে একাডেমিক কমিটিকে নিয়ে ভার্চুয়াল সভা আহবান করে অনলাইন শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত দিকের সংস্কার, পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আমাদের হতাশ শিক্ষার্থীরা দ্রুত সুফল পেতে শুরু করবে বলে আশা কার যায়।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।